কিন্ডার গার্টেন লেভেলে পড়াশুনার চাপ নেই কিন্তু ছোটবেলায় প্রাতিদিন সকাল সকাল উঠে স্নান খাওয়া দাওয়া করে স্কুলে যাওয়া ভাল লাগতনা আমার। সেই তুলনায় পালাকরে ঠাকুমা ও দিদার কাছে শুয়ে শুয়ে গল্প শুনতে ভাল লাগত। প্রায় পচিশ বছর আগের সাল তারিখ ঠিক মনেনেই, তবে এই সময় একদিন যেন হাতে চাদ পেয়ে গেলাম! প্রতিদিন সকালে উঠতাম আর শুনতাম আজ হরতাল তাই স্কুল হবে না, কালও বন্ধ, তার পরদিনও ধর্মঘট! দুএকদিন নয় একটানা অনেকদিন। আজ ভারত বন্ধ, কাল বাংলা বন্ধ, পরশু জেলায় সাধারন ধর্মঘট। রাজনৈতিক ডামাডোলের কারন কি তখন না বুঝতে পারলেও সবার মুখে একটাই নাম শুনতাম, তিনবিঘা কড়িডর। বাংলাদেশকে কড়িডরের জায়গা দেওয়া হবে কিনা ?

পরবর্তী দীর্ঘ আড়াই দশকে তিনবিঘা করিডর বারে বারে ঘুরে ফিরে খবরের শিরোনামে  এলেও কোচবিহার জেলার প্রান্তিক মহকুমার প্রত্যন্ত এই সীমান্তবর্তী এলাকায় যাওয়ার সুজোগ আগে আসেনি। এমনিতে সীমান্ত এলাকা বলতে মনের কোনে উকি দেয় চোরাচালান, গরুপাচার, পুলিশ ও বিএসএফ এর কড়াকড়ি। তাই যত দূরে থাকা যায় তত ভালো। কিন্তু একই জায়গা দিয়ে দুই দেশের মানুষ পারাপার করছে কিভাবে তা নিজে চাক্ষুস করার ইচ্ছে ছিল বহুদিনের। সুযোগ এল চিরঞ্জিবদার ভাই প্রদীপদার অফিসের কাজে মেখলীগঞ্জ আসাতে। প্রদীপদা থাকে কোলকাতায়, অনেকদিন দুজনের দেখা হয়না, তাই চিরঞ্জিব দা যাবে দেখা করতে। সাথে নিয়ে গেল আমাকেও।

অতপর গন্তব্য তিনবিঘা করিডর ভায়া মেখলীগঞ্জ। আমাদের যেতে হবে প্রায় ১৫০ কিমি উত্তর পশ্চিমে । তাই স্কুল থেকে সরাসরি বেড়িয়ে পড়লাম ।  যাত্রী বলতে ড্রাইভার দীপংকর ছাড়া আমি আর চিরঞ্জিব দা । দীর্ঘ ৩৪ বছরের অবহেলার পর বর্তমানে উত্তরের অকুলীন প্রান্তিক জেলাগুলিতে জাতীয় ও রাজ্য সড়কের কাজ পুরোদমে চলছে তাই ডাইভারসন, খানা-খন্দ, জ্যাম প্রভৃতি পেরিয়ে কোচবিহার থেকে মাথাভাঙ্গা পৌছতে সন্ধ্যা নেমে এল । এখনো প্রায় দ্বিগুণ পথ বাকী ! এদিকের রাস্তায় গাড়ির ভির নেই ঠিকই, তবে রাস্তার পিচেরও অবশিষ্ট নেই, সুতরাং গতি ১০-১৫, আমরাও কাহিল । জামালদা পার হয়ে আমরা উঠলাম চাংরাবান্ধ্যা হাইওয়েতে । এবারে যেন হাফ ছেড়ে বাচাগেল । জন্মসূত্রে কোচবিহার জেলার হলেও এদিকটায় আমার কোনদিন আসা হয়নি । পড়ন্ত বিকেলের আলোআঁধারি বাঁশঝাড় আর দূরে ধানক্ষেতের ওপারে বাড়িগুলিতে বিক্ষিপ্ত ভাবে টিমটিম করে জ্বলা আলো । রাস্তায় লোকজনের তেমন দেখা নেই ! তাই সম্বল বলতে হাতের তালুতে বন্দী  TAB ও গুগল ম্যাপের GPS । চারিদিকে এখন ভালো অন্ধকার । রাস্তা ছাড়া প্রায় কিছুই দেখা যাচ্ছেনা । সামনের বাঁক পেরতেই আমাদের পাশাপাশি চলতে শুরু করল কাঁটাতারের বেড়া । কিছুদূর পরপর হ্যলোজেনের হাইমাস্ট । অর্থাৎ ওপারেই বাংলাদেশ । রাস্তার এতো পাশে কাঁটাতার এই প্রথম দেখলাম । সে এক চরম উত্তেজনা, আবার একটু উতকন্ঠাও বটে ! ভুল রাস্তায় চলছি নাতো ? কাঁটাতারের ওপারে বাংলাদেশের বাড়ি ঘর বাজার রাস্তার আলো প্রায় সবই স্পষ্ট দেখাযাচ্ছে । রাস্তার পরপর হাম্পে ( Bump ) গাড়ি দুলে উঠতেই TAB এ চোখ পড়ল লেভেল ক্রসিং, রেললাইন পেড়তে পেড়তে জানালা দিয়ে মুখ বাড়াতেই বাঁপাশে চোখে পড়ল নিউ চ্যাংরাবান্ধ্যা ষ্টেশন । এবার আমরা চলেছি মেখলীগঞ্জের দিকে । সন্ধ্যা সাতটা । কিন্তু মনে হচ্ছে অনেক রাত । প্রায় অনেক দিন পর দুই ভাইয়ের দেখা, স্বভাব সুলভ হাসি ঠাট্টা ও কথোপকথনের মাঝে চিরঞ্জিবদা পরিচয় করিয়ে দিল আমাকে প্রদীপদার সাথে।  ক্ষণিকের সাক্ষাতেই যেন আপন হয়ে গেলাম। গরম গরম চা দিয়ে সন্ধ্যার টিফিনের পর আমরা এগোলাম পরবর্তী গন্তব্যের দিকে। নিজের জন্য বরাদ্ধ সরকারী গাড়ী ছেড়ে প্রদীপদা উঠেছে আমাদের সাথে। 

এবার আমরা চলেছি তিনবিঘা করিডর এরদিকে । পিচের সরুরাস্তা  একেবেকে চলেছে । খানিক এগনোর পর বাঁপাশে প্রথম BSF outpost দেখা গেল । এরপর আমরা যত এগচ্ছি প্রায় প্রতি দশ-পনেড় হাত দূরে এক-দুজন BSF জঙ্গল থেকে বেড়িয়ে আসছে , দূর থেকে পরখ করে দেখছে, হাত নেড়ে এগিয়ে যেতে ইশারা করছে । প্রত্যেকের বাহাতে টর্চ ডানহাতে লাঠি আর ঘারে AK-47 । একে সামনে সরকারী গাড়ি , পিছনের গাড়ীতে আমরা, তাই চাপ কম ! নাহলে কারক বিভক্তির প্রথম পাঠের উত্তর দিয়ে বিদায় নিতে হতো । BSF এর নজরদারী বেশী,সেই কারনেই রাতে মানুষের চলাচল হয়ত কম।

রাতের সীমান্ত পাহারায় সতন্ত্র প্রহরী



রাতে তেমন দেখার নেই । তার উপর বিধি নিষেধের কড়াকড়ি। তাই চিরঞ্জিব দার কাছে আগামী কাল সকালে আবার আসার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ফিরে গেলাম । আমরা উঠেছি তিনবিঘা টি রিসোর্ট হোটেল সিলভার ক্লাঊডে । গরম গরম তাওয়া রুটি ও দেশী মুরগীর কসা, সাথে স্যালাড এক কথায় অনবদ্য।

প্রদীপদা, চিরঞ্জিবদা ও আমি বাদিক থেকে


এখন রাত প্রায় বারোটা । চোখ আর মানছেনা ! তাই গেলেম আমার জন্য বরাদ্ধ ঘরে । রিসোর্ট বলে কথা ! ঘরে কি আছে আর কি নেই ? সারা দেওয়াল জুরে পর্দা । একপাশে কাঁচের দরজা ও বেলকনি । অন্যপাশে পুরটাই উইন্ডো । অন্ধ্যকার তাই দেখা যাচ্ছেনা কিন্তু জলের আওয়াজে বুঝতে পারছি পাশেই কোন নাম না জানা ছোটনদী বয়ে চলেছ । শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘরেসামনের কাঁচের দেওয়ালের পর্দা সরিয়ে মখমলের বিছানা থেকে চাঁদ দেখতে দেখতে ঘুম যাওয়ার বর্ণনা করার কব্জির মানে কলমের জোর আমার নেই । পাখির কলরবে ঘুম ভাঙল অনেক দিন পর । বাইরে হালকা কুয়াশা । সকালে সূর্যের প্রথম কিরণ চোখে পড়তেই বিছানায় উঠে বসলাম । বুঝতে পারছিনা কথায় এসেছি ? একি তিনবিঘা নাকি ডুয়ার্স কিংবা অন্যকোন রিসোর্ট ! চারিদিকে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ চাবাগান, মাঝে ছোট তবে নিরবিচ্ছিন্ন জলধারার সেই স্রোতস্বিনী । বলতে বাধা নেই এই নৈস্বর্গিক শুপ্রভাতের জন্য আবারো আমি শতশত কিমি কোমর ভাঙ্গা জার্নি করতে পারি ! অ্যাটাচ ওয়াশরুম তাই তাড়া নেই । ১০ মিনিটেই রেডি হয়ে নিচে নেমে এলাম।





রাতে রিসোর্টের বাইরেটা দেখা হয়নি । আজ ভালোকরে বাইরেটা দেখলাম। এক সময় এই রিসর্ট যে রমরমিয়ে চলত তা এর বহর দেখলেই মালুম হয়। তবে ভূইফোড় মানিমার্কেটিং কোম্পানি গুলি লাটে ওঠায় এখানকার জৌলসে যে ভাটা পরেছে তা সহজেই অনুমেয়। চারিদিকে আগাছায় ভর্তি। অযত্নের ছাপ দেখে ছোটবেলায় দেখা দা লস্ট ওয়ার্ল্ড ছবিতে দেখানো পুরনো জুরাসিক পার্কের কথা মনে পরে। প্রদীপদা এখনো রেডি হচ্ছে তাই আমরা ফেসবুকের জন্য কিছু পোজ দিলাম! 
সবুজের মাঝে চিরসবুজ চিরঞ্জিবদা















সখের পর্যটক
এখান থেকে অল্পদূরে করিডর তাই দীপঙ্করকে আর ডাকলাম না । চিরঞ্জিবদা ও প্রদীপদা সামনের আসনে । আমি পিছনে বসেছি । ১০ মিনিটের মধ্যে করিডোরে পৌছেগেলাম । তিন বিঘা করিডোর হল একটি সতন্ত্রভূমি যা ভারতের মালীকাধীন তিনবিঘা জায়গার মধ্যে অবস্থিত । এটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মেঘলীগঞ্জ মহকুমা ও বাংলাদেশের লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার সীমান্তে অবস্থিত । ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলে যাতায়াতের সুবিধার্থে এটি বাংলাদেশকে ইজারার মাধ্যমে দেওয়া হয় ।
Tinbigha Corridor Map HD


সমস্ত জায়গাটি দেখতে অনেকটা আয়তকার পার্কের মতো । দুটি যোগাযোগ কারী পিচেররাস্তা পরস্পরকে লম্বভাবে ছেদ করেছে অনেকটা প্লাস চিহ্নের মতো । মাঝে একটি চৌমাথা যেখানে দুজন সিভিক পুলিশ চলাচল নিয়ন্ত্রন করছে । আমরা ভারতীয়রা চারটি রাস্তাতেই হাটতে পারি, দাঁড়াতে পারি, ছবি তুলতে পারি, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ শুধু নিজেদের করিডর দিয়েই জাতায়াত করতে পারে , দাঁড়াতে পারেনা ! সকাল বেলায় আমাদের সামনা দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ জন কাজের জন্য পারাপার করছে । তিনটে বাংলাদেশের ট্রাক্টর পাটগ্রাম থেকে দহগ্রাম প্রবেশ করল । পার্কে বসে ছবি তুললাম কিছু । পার্কটী তেমন আহামরি সুন্দর না হলেও জায়গাটির ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব কম নয় । 
Tinbigha Corridor


তিনবিঘা করিডোরের মাঝে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলে যাতায়াতের রাস্তা । তিনবিঘা করিডোরের চারপাশে কাটাঁতারের বেড়া  । ১৯৭৪ এর ১৬ই মে  ইন্দিরা গান্ধী ও শেখ মুজিবুর রহমান চুক্তি অনুসারে ভারত ও বাংলাদেশ তিনবিঘা করিডোর ( ১৭৮ বাই ৮৫ মিটার ( ৫৮৪ ফু × ২৭৯ ফু )) ও দক্ষিণ বেরুবাড়ীর  ( ৭.৩৯বর্গ কিলোমিটার  ( ২.৮৫ বর্গ মাইল )) সার্বভৌমত্ব পরস্পরের কাছে হস্তান্তর করে । এর ফলে উভয় দেশেই তাদের ছিট মহলে যথাক্রমে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ও দক্ষিণ বেরুবাড়ীর যাতায়াত সুবিধা তৈরি হয় । ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ চুক্তি অনুসারে সাথে সাথেই দক্ষিণ বেরুবাড়ী ভারতের কাছে হস্তান্তর করে যদিও ভারত তিনবিঘা করিডোর বাংলাদেশের কাছে রাজনৈতিক কারনে হস্তান্তর করেনি । এটি হস্তান্তরে ভারতের সাংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন ছিল ।  পরবর্তিতে বাংলাদেশ সরকারের অনেক বিরোধিতার পর ২০১১ সালে ভারত পূর্ণভাবে এটি বাংলাদেশকে দেওয়ার বদলে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে ইজারা হিসাবে দিয়েছিল এই শর্তে যে একই সময়ে দক্ষিণ বেরুবাড়ি ভারতের নিয়ন্ত্রানেই থাকবে । ১২ নং দক্ষিণ বেরুবাড়ী ইউনিয়নের মোট আয়তন ২২.৫৮ বর্গকিলোমিটার ( ৮.৭২বর্গমাইল ), যার ১১.২৯ বর্গকিলোমিটার  ( ৪.৩৬বর্গমাইল ) বাংলাদেশ পেয়েছিল । এছাড়াও পূর্বের ভাগ অনুসারে কোচবিহারের চার টিছিটমহল বাংলাদেশে পড়েছিল যার আয়তন ৬.৮৪ বর্গকিলোমিটার ( ২.৬৪বর্গমাইল ), এভাবে মোট আয়তন ১৮.১৩ বর্গকিলোমিটার  ( ৭.০০বর্গমাইল )  যা বাংলাদেশে স্থানান্তর হওয়ার কথাছিল । ১৯৬৭ সালের হিসেব অনুযায়ী এই ভূখন্ড গুলোর মোট জনসংখ্যার ৯০ %ই ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী । পক্ষান্তরে বাংলাদেশের ছিটমহল দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ভারতে হস্তান্তরের কথাছিল । যার মোট আয়তন ১৮.৬৮ বর্গকিলোমিটার ( ৭.২১বর্গমাইল ) ও ১৯৬৭ সালের হিসেব অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার ৮০% ছিল মুসলমান । যদি এই হস্তান্তর সফল হতো তাহলে এটি জাতিগত দাঙ্গা সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকত । ফলে তখন বেরুবাড়ীর জনগণ এই হস্তান্তরের বিরোধিতা করেছিল । ১৯৭১ এরপর ভারত বাংলাদেশকে প্রস্তাব দেয় বেরুবাড়ীর অর্ধাংশ ভারতের অধীন থাকবে এবং দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা বাংলাদেশেই থাকবে । এই চুক্তি অনুসারে ভারত দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা বাসীর বাংলাদেশের মূলভূখন্ডের সাথে যোগাযোগ রক্ষার জন্য একটি তিনবিঘা আয়তনের জায়গা ইজারা হিসেবে দিয়েছিল । এটি বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত হয়েছিল এবং তিনবিঘার চার পাশে সতর্কতার সাথে বেষ্ঠ্যনী দেওয়া হয়ে  । ১৯৭৪ সালের ১৬ই মে ইন্দিরা গান্ধী ও শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত ১.১৪ ধারা অনুসারে বেরুবাড়ী বিরোধের অবসান ঘটে ।  
শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী ও শেখ মুজিবর রহমান

চুক্তি অনুসারেঃ “ভারত দক্ষিণ বেরুবাড়ীর দক্ষিনাংশের অর্ধেক নিয়ন্ত্রন করবে যার আনুমানিক আয়তন ৬.৮ বর্গকিলোমিটার ( ২.৬৪বর্গমাইল ) এবং বিনিময়ে বাংলাদেশ দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা নিয়ন্ত্রন করবে । ভারত দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা বাসীদের বাংলাদেশের মূলভূখন্ডের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য ১৭৮ বাই ৮৫ মিটার  ( ৫৮৪ ফু × ২৭৯ ফু ) আয়তনের একটি ভূমি বাংলাদেশকে ইজারা হিসেবে দিবে ।” বাংলা আয়তন পরিমাপের একটি একক বিঘা থেকে তিনবিঘা নামের উৎপত্তি, ভূমিটির মোট আয়তন ১,৫০০  থেকে ৬,৭৭১ বর্গ মিটার  ( ১৬,১৫০ থেকে৭২,৮৮০বর্গফুট  ) যা তিন বিঘা পরিমাপের সমান । পূর্বে  করিডোর টি দিনের  ১২ ঘন্টা সময়ের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হত, এতে দহগ্রাম আঙ্গরপোতার অধিবাসীদের কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হতে হত কারন সে সময় সেখানে কোন হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান  ছিলনা  । ২০১১ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর ঢাকায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার একটি চুক্তি অনুযায়ী বর্তমানে করিডোরটি ২৪ ঘন্টাই উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে । ২০১১ সালের  ১৯ শে অক্টোবর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখহাসিনা কর্তৃক আনুষ্ঠানিক ভাবে করিডোরটি উন্মুক্ত ঘোষণা করা হয় ।
                     সূত্র: https://bn.m.wikipedia.org/wiki/তিনবিঘা_করিডোর

পাশেই একটি চায়ের দোকান সদ্য খুলছে । খুচরো নেই তাই ইচ্ছে থাকলেও কপালে জুটলনা । এবার প্রদীপদার ইচ্ছে হল গাড়ী চালানোর হাতটিকে আরেকটু পাকিয়ে নিতে । এমনিতে ফাঁকা রাস্তা, চাপ নেই ! তাই আমরাও হেলেদুলে ধীরে সুস্তে রিসোর্টে ফিরে এলাম । আজই আমাদের ফিরে স্কুল ধরতে হবে তাই ইচ্ছে থাকলেও চলেযেতে হচ্ছে ।
এবার বিদায় তবে


ফেরার পথে এক ঝলক দেখে নিলাম Land Port Authority of India এর নির্মীয়মাণ চ্যাংরাবান্ধ্যা স্থলবন্দর ও নিউ চ্যাংরাবান্ধ্যা ষ্টেশন । এখন এই চ্যাংরাবান্ধ্যা বুড়িবাড়ি সীমান্ত চেকপোস্ট দিয়ে সড়ক পথে শিলিগুরি ঢাকাগামী ভূতল পরিবহনের বাস পরিসেবা রয়েছে । এছাড়া রয়েছে দুই দেশের পণ্য পরিবহন । পথের পাশেই চোখে পড়ল বিশাল ট্রাক টারমিনাস । কে বলতে পারে আগামীতে এখান দিয়েই চলতে শুরু করবে সেই সোনালী অতীতের কোলকাতা কোচবিহার ভায়া রংপুর দূরপাল্লার ট্রেন ।
নিউ চ্যাংরাবান্দা স্টেশন




ফিরে এসেছি নিজের কর্মক্ষেত্রে।  তবুও মনের কোণে গেথে আছে সেই চাবাগান ঘেরা বাংলোর কথা। তাই ক্লাস ফাইভের স্টপগ্যাপে বাচ্চাদের ছবি আকার থিম যদি সেই টি রিসোর্ট হয়, ক্ষতি কি ?

স্মৃতি যেন জোনাকী.......!!



সকাল সাতটার মধ্যেই বাস এসে হোটেলের সামনে হাজির । আমাদেরও ব্রেকফাস্ট খাওয়া হয়ে গেছে তাই দেড়ি না করে চটপট বাসে উঠে বসলাম । একে একে বিভিন্ন হোটেল থেকে যাত্রীরা উঠলেন, এবার আমরা রওনা দিলাম আজকের সারা দিনের উদ্দেশ্যে । আজ আমরা যাব চেন্নাই শহরটি ঘুরে মেরিনা বিচ হয়ে গোল্ডেন বিচ, এরপর কুমীর প্রজনন কেন্দ্র, সেখান থেকে মহাবলীপুরম, তারপর কাঞ্চীপুরম থেকে শ্রী পেরমবেদুর হয়ে আবার চেন্নাইএ । বাসে মোটামুটি জনা পচিশেক যাত্রী । বাঙালি মারোয়ারী পাঞ্জাবি সাবাই আছেন কমবেশি । ও হ্যা আর আছে কালো জামা প্যান্ট উত্তরীয় পরা দুই জন । বাপ- ছেলে হবে হয়তো । আমাদের গাইড একজন তামিল মুসলিম লোক, হিন্দী ভালোই বলতে ও বুঝতে পারেন । তাই ভাষাগত সমস্যা একদম নেই । মাঝেমাঝে তিনি আমাদের সাথে বাংলা পাঞ্জাবিতে কথা বলার আন্তরিক চেষ্টা করছেন । মাঝে মাঝে ভুলভাল হলেও ভালোই লাগছে । টুকটাক ইনফরমেশন দিচ্ছেন আবার মজাও করছেন আমাদের সকলের সাথে ।
   


চেন্নাই শহর এই কদিনে অনেক ঘুরেছি তাই নতুন করে কোন রোমাঞ্চ হচ্ছেনা বটে ! তবে দুটি জিনিস জানতে পেলাম, এতো দিন যাকে বিরাট শপিং মল ভাবতাম তা হল আন্না সলাই বা মাউন্ট রোডের উপর অবস্থিত চেন্নাই বিধান সভা, এবং চেন্নাইএর মেরিনা বিচের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩ কিমি যা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম । 



চেন্নাই ছেড়ে আমরা চলেছি ২৫ কিমি দূরে গোল্ডেন বিচে । এটি একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন সমুদ্র সৈকত এক কথায় সমুদ্রের তীরে গড়ে ওঠা একই ছাতার তলায় ওয়াটার কিংডম, নাগরদোলা চরকি বিভিন্ন জয় রাইড ও খাবার দোকান একত্রে । গাইড আমাদের টকিট কেটে ভিতরে ঢুকিয়ে দিলেন । বিভিন্ন মূল্যের ও বিনামূল্যের নাগরদোলা চরকি আছে । আমি গেলাম সৈকতটি দেখতে । এর নাম গোল্ডেন কেন বুঝলাম না ? দোকানীরা সবে পসার সাজিয়ে বসছেন মাত্র তাই খাবার এখনও তৈরি হয়নি । খানিক ঘোরাঘুরির পর বেরিয়ে এলাম । বাকিরা এখনো আসেনি তাই গাইডের সাথে গল্প করছি । পন্ডিচেরীর মাতৃমন্দিরে দামি সানগ্লাসটি ফেলে এসেছি ! তাই গেলাম আরেকটা কমদামী কিনতে, গাইডই দরদাম করে দিল । এরপর আমরা গেলাম কুমীর প্রজনন কেন্দ্র বা ক্রোকোডাইল পার্কে, এখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৫০০০ কুমীরের বাস । চারিদিক গাছ পালায় ছাওয়া । বিপদ একটাই, গাছে হাজার হাজার বক, তাই সাদা কালি থেকে সাবধান ! চারিদিকে অবহেলার ছাপ বর্তমান । একটি মিউজিয়ামে কুমীরের জীবনচক্র ডিম অস্থি কঙ্কাল সংরক্ষিত রয়েছে । পাশেই একটি কাঁচের ঘরে আছে পৃথিবী বিখ্যাত সরীসৃপ । নানা প্রকার সাপ দেখলাম । এখানে প্রতিদিন বিকাল বেলায় সাপ থেকে বিষ বারকরা দেখানো হয় । আশপাশ গন্ধে ম ম করছে তাই নাকচাপা দিয়ে বেরিয়ে এলাম ।
বাস চলছে East Coast Highway ধরে দক্ষিনে বাদামী বালু মাটির উপর কালো পিচের চওড়া রাস্তা । বাদিকে দিগন্ত বিস্তৃত বঙ্গোপসাগর, ডানদিকে একাধিক ব্যাকওয়াটার বা সমুদ্রের জল আটকে পড়ে সৃষ্টি হওয়া লবণ হ্রদ । চারিদিকে ঝাউবন । এক কথায় অসাধারন ! একে একে পার হোলাম অশোক লিল্যান্ড মারুতি সুজুকি হুন্ডাই প্রভৃতি গাড়ি তৈরির কারখানা, সমুদ্রেরজল পরিস্রুত করে চেন্নাইএ পাঠানোর বিশালবড় প্ল্যান্ট ইত্যাদি । 
বাস এসে থামলো একটি বিশাল হোটেলের সামনে । আশেপাশে কোন দোকান নেই ! পার্কিং এ ছোট বড় অনেক গাড়ি । ভিতরে দেশি বিদেশি পর্যটকের ছড়াছড়ি । হাত ধুয়ে বসে পড়লাম খেতে । একটি থালায় দশটি সব্জি ভাজা ডালের বাটি । মাঝে দুটি রুটি ! গাইডকে দেকে বললাম আমরাতো ভাত খাব ? সে বলল রুটির পর ভাত দেবে । এই প্রথম আমার সাউথ ইন্ডিয়ান থালি খাওয়া । কম তেলও যে এতো সুন্দর রান্না হয় এই প্রথম খেলাম । শেষ পাতে আবার চাটনি দই মিষ্টি, একেবারে জামাই আদর ! আমাদের সামনে দুজন খেতে বসেছেনএকজন মহিলা ও তাঁর মা । মহিলার মাথার চুলের স্টাইলটা কেমন যেন উল্টানো টবের মতো কাটাকানে মোটা মোটা দুল । ঠিক যেন প্রজ্ঞানসূতকল্পের থেকে উঠে আসা কোন চরিত্র খেতে খেতে কথা হচ্ছিল । তাঁরা এসেছেন মালোয়েশিয়া থেকে এদিকটা ঘুরতে । আদি বাসস্থান ভারতে, তবে এখন সেখানকার একটি কলেজে অধ্যাপনা করেন তাঁর কাছেই শুনলাম এককালে মহাবলী পুরম বা মামাল্লাপুরম ছিল পল্লব চোল প্রভৃতি সাম্রাজ্যের উল্লেখযোগ্য সমুদ্র বন্দর । এর সাথে উৎকল তাম্রলিপ্ত প্রভৃতি বিভিন্ন বন্দরের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল ! এখান থেকেই চোল রাজারা সুদূর দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ায় বলি সুমাত্রা জাভা প্রভৃতি দ্বীপে নিজেদের উপনিবেশ স্থাপন করেছিল ।





এসে পৌছালাম মহাবলীপূরম বা মামল্লাপুরমে । চেন্নাই থেকে এখানকার দূরত্ব ৫৬ কিমি । এখানে রয়েছে পঞ্চরথ মন্দির, শোর টেম্পল, গুহা মন্দির প্রভৃতি দর্শনীয় স্থান বাস থেকে নেমে প্রথমেই যেটি চোখে পড়ল, তা হল অর্জুন কেভ । একটি অনুচ্চ পাথরের টিলার (পাহাড় নয়) গায়ে মহাভারতের বিশেষত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের বর্ণনা খোদাই করা পল্লব স্থাপত্য প্রসঙ্গত বলা যায় পঞ্চ পান্ডবরা এখানে কখনই ছিলেন না । তবে তাদের স্মৃতিতে তৈরি করা এই গুহা যা আদি দ্রাবিড় স্থাপত্যের নিদর্শন গাইডের কাছে শুনলাম এটি একটি ভারতীয় ‘একশিলা পাথর খোদাই স্থাপত্য’ যা খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল পল্লব রাজা প্রথম মহেন্দ্রবর্মণ ও তাঁর পুত্র প্রথম নরসিংহবর্মণ (৬৩০-৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে) এর আমলে । টিলার গা বেয়ে সিড়ি উঠে গেছে । উপরে উঠলে কাছের মহাবলী পূরম সমুদ্র সৈকত ও সৈকত মন্দিরটি (Shore Temple) দেখা যায় । টিলার উপর ঢালু অংশে রয়েছে আস্ত একটি গ্রানাইট জাতীয় আগ্নেয় শিলার বিশাল বড় চাই । এটি ‘শ্রীকৃষ্ণ বাটার বল’ নামে পরিচিত । স্থানীয় মানুষের কাছে এটা খুবই বিস্ময়ের যে সুনামিতেও নাকি এটি গড়িয়ে পড়েনি ! আমি বললাম সুনামির সাথে এর সম্পর্ক কি ? গাইড আর তেমন কথা বাড়াল না । আসলে ভূগোল নিয়ে সারা বছর টানা-হ্যাচরা করে কাটে তো , তাই হয়ত Physical Weathering এর একটি উদাহরণের চেয়ে প্রাচীন স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের শিল্পনৈপুণ্য এখন আমার কাছে অনেক বেশী আকর্ষণীয় লাগছে । এবার গেলাম বেলাভূমির সৈকত মন্দিরে । এই মন্দিরে একই সাথে পূজিত হন মহাদেব ও বিষ্ণু সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের আলোয় রঙিন হয়ে ওঠেন মন্দিরের দেবতারা পল্লব রাজাদের শিল্পনৈপুণ্যের একটি সাক্ষর হল পঞ্চরথ মন্দির। এখানে রয়েছে অনুপম ভাস্কর্য আরো শিল্পমণ্ডিত পাঁচটি মন্দির প্রসঙ্গত ১৯৮৪ সালে ইউনেস্কো অর্জুন রথ সহ মহাবলীপুরমের স্মারক স্থাপত্যগুলিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেয় । 


কপাল খারাপ ! তাই রাস্তায় জ্যাম থাকার জন্য কাঞ্চী পূরমে পৌছতে সন্ধ্যা নেমে গেল । প্রাচীন শহর তায় আবার তীর্থস্থান তাই পারকিং নিয়ে সমস্যা । এতো দূর থেকে এসেছি মন্দিরের ভিতরে যাবনা ? শুনলাম সন্ধ্যা আরতির পর ৭ টা নাগাদ মন্দির বন্ধ হয়ে যাবে । আবার দৌড় । আমাদের উত্তর ভারতের মন্দিরের থেকে দক্ষিন ভারতের মন্দিরের ধরন অনেক আলাদা । অনেকটা দুর্গের মতো । প্রধান ফাটক পেরিয়ে ভিতরে প্রবেশ । চারিদিকে উচু প্রাচীর । আবার দরজা ! তার ভিতরে মূল চত্বর । এরপর মন্দির । না জানা থাকলে এক কথায় গোলক ধাঁধা ! আসলে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আক্রমণ থেকে মন্দির গুলি বাচাতে এই ব্যবস্থা আরকি ! যাই হোক আমাদের সাথে সেই তামিল পিতা পুত্র থাকায় গোলক ধাঁধায় তেমন নাজেহাল হতে হোলনা । চাতাল পেরিয়ে মূল মন্দির প্রায় একবার পরিক্রমা করে তবে সিড়ি পেলাম । সোনার সিড়ি ! সন্ধ্যা রাত্রি তাই তেমন ভিড় নেই । পুরোহিত আরতি করছেন । আমাদের ঘিয়ে ভাজা খিচুড়ির মতো প্রসাদ দিলেন । এবার ভাবলাম বোধ হয় ফেরার পালা ? কিন্তু সেই তামিল দুইজন ঘড়ি দেখে, স্বর্ণ মগর স্বর্ণ মগর বলে চেঁচাতে চেঁচাতে দৌড় দিল ! যাচ্ছেলে ! বার হয়ার রাস্তা একমাত্র এরাই ভালো জানে, যেহেতু একই সাথে বাসে ফিরবো তাই এদের ধরতে লাগালাম দৌড় অনেকটা ছোট বেলার ‘চোর-পুলিশ’ খেলার মতো । ডান বাম উপর নীচ কোন দিকেই হুশ নেই ! শেষে এসে পৌছালাম একটি কাউন্টারের সামনে । তামিল তেলেগু মালায়লম অনেক ভাষাতেই লেখা আছে বুঝলাম কেবল Rs. 2/- যাইহোক তাদের দেখাদেখি আমরাও চার টাকা দিয়ে দুটি টিকিট কেটে পিছন পিছন দাড়ালাম । কিছুদূর এগিয়ে দেখি কাঠের একটি সিড়ি উপরে উঠে গেছে । চিলেকোঠায় উঠতে হবে নাকি ! সিড়িটা অনেকটা নাগরদোলায় ওঠার সিড়ির মতো । এক পাস দিয়ে উঠে অপর পাশে নামা যায় ! এবার বুঝলাম ব্যাপার কি ? আমাদের ভগবান থাকে মন্দিরের পিছনের দেওয়ালে । কিন্তু কাঞ্চীর এই স্বর্ণ মগর রয়েছে ছাদে ! তাই সবাই সিড়ি দিয়ে উপরে উঠে তাঁকে স্পর্শ করে নামছে । এও এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা নয়কি ! ফেরার সময় দেখলাম মন্দিরের এক কোণে প্রসাদ বিক্রি হচ্ছে । একটি লাড্ডু ২০ টাকা । কেনাকাটির পর বের হলাম মন্দির থেকে । দেখি গাইড আমার ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে বাইরে অপেক্ষা করছে । তিনজনে মিলে একটা লাড্ডু প্রসাদ ভেঙে খেলাম । সামনেই একাধিক কাঞ্চীপুরম সিল্ক শাড়ির দোকান । দোকানের ভিরতেই শাড়ি তৈরির কারখানা । বাইরে যে শাড়ি গুলির দাম তিন থেকে চার হাজার টাকা এখানে তার দাম তেরশো থেকে আঠারশো টাকার মধ্যে । আবার ৩০ শতাংশ টাকা দিয়ে বুকিং করা যায় ! VVP করে বাড়ি পাঠিয়ে দেবে অনেকটা Cash on Delivery এর মতো । কেনাকাটির পর একটু খওয়া দাওয়া চাপান সেরে বাসে উঠে বসেছি । এবার শরু হল হকারদের উৎপাত । হাতে চামড়ার চপ্পল । এক জোড়া ১৫০ টাকা । বলা ভালো এই চপ্পলের দাম শেয়ার বাজারের ওঠে-পড়ে ! একটু ধৈর্য ধরতে হবে এই যা । আগরতলার এক দাদা যে চপ্পল কিনলেন ১২০ টাকা দিয়ে বাস ছাড়ার সময় তাই কিনলাম ৬০ টাকা দিয়ে !

হাইরোড ধরে বাস চলেছে উত্তর পূর্বে চেন্নাইএর দিকে । সবাই মোটামুটি ঘুমে আচ্ছন্ন । হঠাৎ গাইডের ডাকে ঘুম ভাঙল । আমরা এসেছি শ্রী পেরমবেদুরে । এক অসম্ভব নিস্তব্ধতা ! ১৯৯১ সালের ২১শে মে ভারতের প্রাক্তন প্রধান মন্ত্রী শ্রী রাজীব গান্ধী  LTTE আততায়ী দ্বারা এখানকার এক জনসভায় নিহত হন । তাঁর সাথে শেষ হয়ে যায় ভারতের এক সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল ইতিহাস । এখানে একটি সৌধ ও মিউজিয়াম রয়েছে সেখানে । 

* * * * * * * 
চেন্নাইতে প্রবেশ করেছি । একে একে সবাই নিজেদের হোটেলের সামনে নেমে যাচ্ছে । অ্যাপেলো হাসপাতালের সামনে গাড়িটা দাড় করানোয়, কমল গাইডকে বলল, তার কিছু ঔষধ নিতে হবে । গাইড বলল এখানে দেরী না করে, চেন্নাইতে খুজলেই হবে । কোন চিন্তা নেইযাই হোক রাত পোনে দশটা নাগাদ চেন্নাই সেন্ট্রালের সামনে এসে আমাদের বাস থামলো । আমরা নামতে গেলাম, গাইড বলল দাড়ান, সবাইকে নামিয়ে দিয়ে, ঔষধ কিনে তারপর আপনাদের নামিয়ে দেব ! এও বাস্তব ! হ্যাঁ, রাত দশটার সময় একটা আস্ত বাস নিয়ে, একটা নয় দুটো নয়, পাচ পাচটা অ্যাপেলো ফার্মেসি খুজে, নিজে বাস থেকে নেমে ঔষধ কিনে এনে দিল । হোটেলের সামনে নামার পর হাত নেড়ে তাঁকে বিদার জানালাম । কমিটমেন্ট দায়ব্ধতা কাকে বলে আজ শিখলাম । জীবনে তাঁর সাথে হয়তো আর কোনদিন দেখা হবেনা, তবে স্মৃতিটুকু থেকে যাবে ! 




মূল ভ্রমণ কাহিনী  
বিষদে পড়ার জন্য ক্লিক করুন

চেন্নাই বা তামিলনাড়ু সম্পর্কে আমার ধারনা বলতে ওই হিন্দি ডাব করা সাউথ ইন্ডিয়ান মুভিসের মতো । অত্যন্ত লাউড । মনে পড়ে, একবার পুরী থেকে ভুবনেশ্বর বাসে করে যেতে হয়েছিল । ভিডিওকোচ বাস । সিনেমার নাম ‘ইন্দ্র দা টাইগার’ । একে তীব্র গরম, তাতে আবার সিনেমায় বিভিন্ন চরিত্রের অনর্গল আস্ফালন, প্রান প্রায় ওষ্ঠাগত । ভিলেন, সেতো লাদেনের থেকেও ভয়ানক, আর নায়ক ? সে নাচলে মেঘ থেকে বৃষ্টিহয়, রাগলে মানুষ শেষ বারের মতো শুয়েপড়ে ! বাস থেকে নামার পর প্রায় দুই গ্লাস ডিস্প্রিন খেয়ে সেই যাত্রায় রক্ষে পাই  আমার এক দিদি বলেছিল যখন দেখবি বায়ে সমুদ্রের জল স্থির আর চারিদিকে দুর্গন্ধ, বুঝবি সামনেই চেন্নাই ! ভিতরে বসে আছি তাই দুর্গন্ধ পেলামনা, তবে জানতে পারলাম বেসিন ব্রীজ জংশন  । এর পরেই চেন্নাই । জানিনা এখনেই ইতিহাসের বসিনের সন্ধি হয়েছিলো কিনা ? চেন্নাই সেন্টাল স্টেশনে আমাদের ট্রেন পৌছালো বিকাল পাঁচটা নাগাদ । কামড়া থেকে নেমে বুঝতে পারলাম চেন্নাইএর গরম কি জিনিস ! স্টেশন থেকে বের হতে হতে একেবারে ঘেমে স্নান করে ফেলেছি । বাইরে দেখি কাতারে কাতারে মানুষ বাস ধরার জন্য দাড়িয়ে । আমাদের যা ব্যাগ পত্র তাতে বাসে উঠা বেশ চাপের । এর আগে কমল ট্যাক্সি করে গেলেও এবার বোধ হয় হাতেখড়ি দেবে ! বাসের নম্বর 54B গন্তব্য পোরর, পোনামাল্লীর আগে । কিছুপরে একটা ফাকা বাস এলো পোনামাল্লী লেখা কিন্তু ভির নেই ! কমল দৌড়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করাতে কন্ডাক্টর বলল ইল্লা ন্ ন্ কিন্তু জালানার পাশে বসা একজন ভদ্রলোক বলে উঠলেন Yes,  come…  come… !  যা বাবা, দুজনের দুরকম কথা ! একেতো ভিড়, তাতে এতো ব্যাগ, সময় বলতে কয়েক মুহূর্ত ! উঠেই পড়লাম বাসে । ভিড় থেকে তো বাঁচা যাবে ! ফাকা বাস তাই যেখানে খুশি বসে পড়লাম । এবার তিনি যা বললেন তার মানে এই দাড়ায় যে ‘বাসটি পোনামাল্লী থেকে আসছে, সামনে ব্রডওয়ে বাসস্ট্যান্ড, সেখান থেকেই এটি আবার পোনামাল্লী রওনা দেবে, তখন আমরা পোররএ নামতে পারবো’ । প্রথম পরীক্ষায় পাশ করলাম আমরা ! পোরর পৌছতে রাত আটটা বেজে গেল । সুতরাং খেয়ে দেয়ে ঘুম । পরদিন কমল গেল কাজে । আমিও গেলাম পিছ পিছে । সেখানেই দুজনে খওয়া দাওয়া করে বের হলাম । দুপুর দুটো । এবার যাব মেরিনা বীচ দেখতে । এবার আমার পালা । এক ডাব আলা আছে তাকেই জিজ্ঞাসা করলাম । সে আমাকে হাত নেড়ে মাথা নেড়ে অনেক বোঝালো । বুঝলাম শুধু ইল্লা ইল্লা আর ছেরি ছেরি ও আর আপ্পুরি-য়ায়া ! প্রায় মিনিট খানেক কাঠালের পাতা চিবোনোর পর মনে হল আমার চয়েসটাই ভুল । এরপর একজন ভদ্রস্থ লোককে জিজ্ঞাসা করায় উনি বললেন 11H নম্বর গাড়িতে উঠতে । ব্রডওয়েতে পৌছানোর পর সেখান থেকে আবার মেরিনা বিচের বাস ধরতে হবে । সেই বাসের নম্বর A2 । চেন্নাইতে কোন শিক্ষিত বয়স্ক পুরুষ বা মহিলাকে একবার স্যার বা আম্মা বলে কিছু জিজ্ঞাসা করলেই হয়েছে, মাথায় হাত- পিঠে চাপড় দিয়ে ছেলে না বানানো পর্যন্ত নিস্তার পাওয়ার  কোন চান্স নেই !
আমদেরই ভুল, তারাহুরতে 11H এর বদলে 11E নম্বর বাসে উঠে পড়লাম । কন্ডাক্টর বললেন এটাতেও ব্রডওয়ে যেতে পারবেন তবে ভেদাপালানিতে গিয়ে বাস চেঞ্জ করতে হবে ! তাই হোক, শহরটাতো ঘোরা হবে । শহরের প্রতিটি রাস্তার মোড়ে, উচু উচু বাড়ি গুলিতে রাজনৈতিক পোস্টার ব্যানার ও কাটআউটে ছয়লাপ । আমাদের এখানকার প্রায় সব রাজনৈতিক দলের পোস্টারে বেশিরভাগ নেতা নেত্রী হাতজোড় করে ভোট চেয়ে থাকেএখানে, চেন্নাইতে ব্যপারটা আলাদা শহরের প্রায় প্রতি রাস্তার বিভিন্ন মোরে একজন রাজনৈতিক নেতার ইয়া বড় বড় ছবি কাটআউট প্রায়ই দেখালাম লাল লাল ভাঁটার মত চোখ, শরীরে রুদ্রাক্ষের মালা, মোটা রেকট্যাঙ্গল গোঁফ, সাদা হাফশার্ট, সাদা হাফলুঙ্গি, মানে অ্যাপিয়ারেন্স দেখলে মনে মনে লুঙ্গিতে গোঁজা কাটারিটা কল্পনা করে নিতে একটুও ভুল হবে না, আর এটাও ভেবে নেওয়া যায়, ঐ কাটারি দিয়ে লোকটা এইমাত্র কারও মাথা বডি থেকে আলাদা করে এসেছে। সেই রকমের মুখে মানুষকে প্রায় আঙ্গুল দেখয়ে ভোট চাওয়া ! এই হল পোস্টার ! এক জায়জায়  তো তাঁকে দেখলাম, মানে ছবিত, তিনিই নেতাজি, তিনিই ভগৎ সিং, তিনিই মঙ্গলপান্ডে ......... বাপরে আরতো পারা যায়না ! একই অঙ্গে বহুরূপ ! পরে বুঝেছি এতো লাউড কেন ? রাজনীতিও এখানে সিনে ড্রামাটিক ওয়েতে চলে আরকি । জয়ললিতা করুণানিধি সবাই একসময়ের নামকরা অভিনেতা অভিনেত্রী । তাঁরাও ওই ! 
ভেদাপালানী বাস স্ট্যান্ডের পাশে একটি সিনেমা হল রয়েছে । সিনেমা ও সিনেমাহলের নাম কোনটাই পড়তে পারলামনা । তবে পোস্টারটি এ কদিনে চেন্নাইএর রাস্তায় অনেকবার দেখেছি । পোস্টারে দেখলাম এককাধ চুল নিয়ে একটি ছেলে সরসা ক্ষেতের মধ্যে ছুটছে, হাতে রামপুরী ! অভিপ্রায় বলার অপেক্ষা রাখেনা । অবশেষে  ব্রডওয়ে বাস স্ট্যান্ড থেকে A2 নম্বর বাসে মেরিনা বিচে পৌছলাম ভাঁড়া মাত্র ৫ টাকা । মাদ্রাস ইউনিভারসিটির সামনে নামিয়ে দেবে । সাব ওয়ে ব্যবহার করুন, সামনেই মেরিনা সমুদ্র সৈকত । চেন্নাই শহরে সময় কাটানোর একটি ভালো জায়গা হল মেরিনা বীচ । বিকালে মোটামুটি একটা ছোট মেলা বসে । খাবার, জামা জুতো, খেলনা বেলুন কি নেই ! ঘোড়া উট সবই আছে । চাইলে উঠে ঘুরতে পারেন । ছবি তুলতে পারেন । দূরে বীচের মধ্যে একটি তাবুতে জোরে জোরে মাইক বাজছে, জেনারেটর আলো ফ্যান সবই আছে এখান থেকে মনে হচ্ছে তাবুর চারিদিকে অনেক ছেলে মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে । কাছে গিয়ে দখি এতো চাঁদেরহাট ! কে নেই সেখানে ? অমিতাভ সলমন শারুক কাজল রানী প্রিতি এমনকি জয়ললিতা করুণানিধি কে নেই ? মানে কাটআউটে ! এই মেরিনা বীচেই পাওয়া যায় এক মাত্র সুযোগ নিজের পছন্দের নায়ক নায়িকা, রাজনৈতিক নেতা নেত্রী, ক্রিকেটার সবার সাথে ছবি তোলার ! প্রমান সাইজের পঞ্চাশ ষাটটি কাটআউট বাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । যাকে পছন্দ, তার ঘাড়ে কোমরে হাত দিয়ে দাড়ালেই হল । ১০ মিনিটে ফটো রেডি ! দক্ষিনা ৫০ টাকা । জানিনা এমনও কতজন আছে যারা এই ফটোগুলি তুলে নিয়ে গিয়ে বাড়ির দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখে ! সত্যিই Incredible India ! 

এর পর গেলাম আন্না স্কয়ারে । মেরিনা বীচের পাশেই তৈরি করা হয়েছে তামিলনাড়ুর প্রিয় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী রামচন্দ্রের বিশাল স্মৃতিসৌধ । সমাধি বেদী অনেকটা রাজঘাটের গান্ধীজীর মতো । মসাল জ্বলছে । বেদীতে কান রাখলে নাকি আন্না কথাটা শোনা যায় ! দু- তিন বার ট্রাই করলাম । আরনা অনেক হয়েছে ! এরপর নিজেকেই ছাগল মনে হবে । চারপাশ গাছপালা দিয়ে ঘেরা । এই গরমে ছায়াতে বসে থাকতে ভালই লাগল । কাছেই চিপক স্টেডিয়াম । এবার গেলাম সেখানে । আইপিএল নেই তাই গেটে বিশাল বড় তালা । এখন ফিরছি অ্যানিবেসান্ত রোড ধরে ।

এই কদিনে বীচরোড, মাউন্ট রোড বা আন্না সালাই, প্রেয়ার কর্নার, থাউজেন্ট লাইট, গিন্ডি কেকেনগর মুখস্ত হয়ে গেছে । এখন যাব CMBT বা চেন্নাই মফসিল বাস টার্মিনাস বা পেরেম্বেডু তে । সেখানে গিয়ে খোজ নিতে হবে পন্ডিচেরী তিরুপতির বাস কখন ছাড়ে ইত্যাদি । দুপুরে রাস্তা প্রায় ফাকা । একজন ভদ্রলোক সাদা জামা কালো চশমা পড়ে অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে দম দিচ্ছেন ! তাকেই জিজ্ঞাসা করি ? যেই না বুঝতে পেরেছে তার দিকে যাচ্ছি সঙ্গে সঙ্গে ম্যান সুপার ম্যানের আদল নিয়ে ফেলেছে । একটা বড় পাথরের উপর বা পা রেখে দুই হাত ঘুরিয়ে রজনীকান্ত স্টাইলে উলটো আমায় জিজ্ঞাসা করল Any Problem ? হারিব্বা ! হকচকিয়ে আমিই বললাম No Thanks ! সে বিজয় সুলভ কলগেট হাঁসি দিয়ে অফিসে ঢুকে গেল । এখান থেকে CMBT এর ভাঁড়া ১৪ টাকা ।  আলু তালু ব্রহ্মতালু সব খোজ নিয়ে আসতে রাত হয়ে গেল ।
  
বিষদে পড়ার জন্য ক্লিক করুন

পন্ডিচেরী থেকে ফিরে আমরা চেন্নাইএর যেখানে উঠেছি তার নাম হোটেল রাম লক্ষী হাটা পথে চেন্নাই সেন্টাল স্টেশন, সামনেই রিপন বিল্ডিংস বা চেন্নাই মেট্রোপলিটন কর্পোরেশন । ব্যালকনী থেকে দেখা যায় লোকাল ট্রেন গুলি সামনের পার্ক স্টেশন ছেড়ে চলে যাচ্ছে । তবে রিপন বিল্ডিংসের সামনের পার্কটি এখন মেট্রোরেল স্টেশন তৈরির কাজে মুছে গেছে । আমাদের হোটেলের সামনের রাস্তা দিয়ে ২ মিনিট পায়ে হাটা পথে রয়েছে নেহেরু স্টেডিয়াম । বিকালে গেলাম সেখানে । ভালোই লাগলো । চেন্নাই শহরে অফিস আওয়ারে হাজার হাজার বাইক স্কুটি নিয়ে নারী পুরুষ উর্দ্ধশ্বাসে নিজেদের গন্তব্যে ছুটছেন কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় কারো মাথায় হেলমেট নেই । অনেকে তো দেখি খালি পায়ে বাইক চালাচ্ছেন ! প্রতি মোরে ট্রাফিক আছে তবে তা বাস ট্রাকের জন্য । 


















আমার মতে চেন্নাই শহর ঘোরার ভালো সময় দুপুর বেলা এই সময় সিটি বাস গুলি ফাকাই থাকে তবে ভির থাকলেও পকেট মারের ভয় নেই কন্ডাক্টর ভুলেও কাছে আসবেনা , তাই নিজেকেই উঠে গিয়ে টিকিট কাটতে হবে ! কদিনেই চন্নাই বেশ ভালো লেগে গেছে মানুষ জন যথেষ্ট সৎ চেন্নাইএর মানুষকে দেখে শেখার আছে, তাই অন্যের দেখাদেখি এখানে, আমারও ভিড় বাসে বয়স্ক পুরুষ বা মহিলাকে আসন ছেড়ে দিতে ভালই লাগে ! হোটেলের যে ছেলেটি আমাদের সার্ব করত সে আবার আগরতলার ! বাংলা বোঝে , তার কাছেই জানলাম ইল্লা (Not yes) মানেনাআর সেরি (Not Sorry) মানেওক্কে আমরা উত্তর ভারতের মানুষ যখন উপর নিচে মাথা দোলাই মানেঠিক ঠিক’, আবার ডানে বায়ে যখন মাথা দোলাই মানেকখনই নয় তামিলে এটি উলটো পন্ডিচেরী নিজেরাই ঘুরে এসেছি বাসের টাইম টেবিল কিছুই জানিনা চেন্নাই ফিরে হোটেল পেতে সমস্যা হয়েছিল তাই বাকি দুটি টুর ট্র্যাভেল এজেন্সির মাধ্যমে করার কথা ভাবলাম

বিষদে পড়ার জন্য ক্লিক করুন


মহাবলী পূরম কাঞ্চী পূরম ঘুরে এসছি । মাঝে একটা দিন রেস্ট । কি করি ? শেষে খোজ নিয়ে জানলাম শহরেই অনেক দেখার আছে । হোটেলের থেকে একটা আইডিয়া ও রুট চার্ট নিয়ে রওনা দিলাম । বাসে বাসে । প্রথমে চন্নাই গভমেন্ট মিউজিয়াম । ক্যামেরা নিয়ে প্রবেশ নিষেধ । যা বাবা ! লকারও নেই ! অগত্যা পালা করে ঢুকতে হল । ভিতরটা নম নম করে সারলাম । বাইরে যা পারলাম তুললাম । তবে মন ভরলো না বস ।


হোটেলের ছেলেটির কাছেই শুনে ছিলাম চেন্নাইএ কেনাকাটি করার ভালো জায়গা বলতে টি নগর । সেখানেও গেলাম । বিশাল বিশাল শপিং মল । এক একটি প্রায় দশ তলা ।  একই ছাদের নিচে সোনাদানা থেকে তরকারিপাতি সবই আছে । দেখি, সবাই জুতো খুলে দোকানে ঢুকছে ! কমল কিনল জামা, আমি কিনলাম প্যান্ট । এদিকের খাবার দোকান গুলি অনেকটা উত্তর ভারতের মতো । ভালো খাবার দাবার পাওয়া যায় । মন ভরে খেলাম এখানে । কাল আবার যাব লর্ড তিরুপতি দর্শনে । সকালে উঠতে হবে তাই খেয়ে দেয়ে ঘুম । 

বিষদে পড়ার জন্য ক্লিক করুন

কাল রাত ১ টা নাগাদ হোটেলে ফিরেছি তিরুপতি থেকে । ভাগ্য ভালো তাই রাস্তায় ঘুমোতে হয়নি । দারোয়ান গেট খুলে দিয়েছে । আসলে তামিলদের কমিটমেন্ট দায়ব্ধতা দেখার মতো । আগের দিন রাতে মালিকের এক ভাইকে বলেছিলাম কাল ভোর পাচটায় তিরুপতি যাব । ঠিক বলে রেখেছে । আজ আবার সারা দিন রেস্ট । সন্ধ্যায় বের হবো বাড়ির জন্য কিছু কেনাকাটি করতে হবে । ঘরে বসে একটা ডাব করা তামিল সিনেমা দেখলাম । নাম মগধীরা । এখন আর তেমন খারাপ লাগছে না । হয়ত ভালো মন্দের মিশেলে ধাতস্ত হয়ে গেছি ।  
প্রায় ৬-৭ দিনে তামিলনাডুর অনেক গ্রাম শহর দেখলাম । তামিলনাড়ুর গ্রামগুলি অনেকটা মণিরত্নমের রোজা সিনেমার “ রুক্মিনী... রুক্মিনী... ” গানটার মতো । একগাদা বুড়ি আর এক আধজন সুন্দরী ! কিছু করার নেই ! “Sometime ordinary looking girls are to encircle the heroine to shown her unequal beauty.”  এটা স্ক্রীনে কনট্রাস্ট আনার জন্য কিনা জানিনা, তবে দক্ষিন ভারতের গ্রামীন চিত্রপট তাইই বলে  অধিকাংশই মানুষই মাঝবয়েসী, কি বুড়োবুড়ি। যাকেই দেখি তারই পাকা চুল, চুল থেকে বেরুচ্ছে তেলের গন্ধ, চুলে গোঁজা সাতসকালের বেলফুলের মালা যা অর্ধেক শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। একেকজন বুড়ির আবার কী অদ্ভূত রকমের শখ, মুখে হলুদবাটা মাখা মেখে বসে আছে ! গ্রামের ছেলেরা তাদের মা ঠাকুমাদের যথেষ্ট সম্মান করে । শহুরে আদপ কায়দা হয়ত এদের নেই কিন্তু এদের সম্বল বলতে আছে মা ঠাকুমার ন্যায় পরায়ণতার শিক্ষা, প্রতিকূল অবস্থাতে টিকে থাকার জেদ, আর অসম্ভব জাত্যাভীমান বেশিরভাগ গ্রামের রাস্তার মোড়ে দুজন ভগবানের মুর্তি দেখাযায়, পাশাপাশি বসে আছেন । হয়ত দুই ভাই কিংবা দুই বন্ধু হবেন । হয়ত আমাদের মতো ! কিন্তু এখানেও সেই স্টাইল! ভাঁটার মতো চোখ, ভগৎ সিং এর মতো মোচ, তাই ভক্তি কম ভীতি বেশী । রাতে হঠাৎ দর্শন হলে, নিজের বুকে থুতু দিতেও হতে পারে ! গ্রামের ছেলেদের খেলাধুলাও এক বিচিত্র রকমের । ষাঁড়ের লেজ ধরে তাঁকে বাগে আনা । রোমান কলোসিয়ামে ম্যাটাডোররা যা করত লাল রঙের পতাকা দেখিয়ে এখানে তাঁরা করছে হাজার জনের মাঝে প্রায় খালি হাতে । কি আসুরিক প্রবৃত্তি । এইতো পেপারে পড়লাম জালিকাট্টি নামক স্থানে এই রকম এক খেলায় প্রায় ৯০ জনের মতো আহত হয়েছে । উচ্চ শিক্ষিত পরিবার গুলির কথা জানিনা তবে মধ্য ও নিম্নবিত্ত সামাজে নারীরা যে পুরুষের পায়ের নীচে অবস্থান করে তা সেখানকার লোকেদের আচরণেই বোঝা যায় ।

এবার আসি শহরের মানুষ জনের কথায় । ট্রেনে আসার সময় অন্ধ্রপ্রদেশ সীমানায় একদল কালো জামা প্যান্ট এবং কালো উত্তরীয় পরা মানুষ উঠেছিল । আমিতো ভেবে ছিলাম খবর হয়েছে ! ট্রেনে ডাকাত পড়েছে ! পরে একজন বলায় বুঝলাম এরা ধর্মপ্রান তামিল, মানত আছে তাই এরা একমাস খালি পায়ে কালো জামা কাপড় পরে দাঁড়ি না কেটে থাকবে । চেন্নাই শহরে বাটা- উডল্যান্ডের এতো জুতোর দোকান তবুও অধিকাংশ তামিল সাধারন মানের চটি নয়তো খালি পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে । এমকি শুনলাম এরা নাকি বিশেষ দিন বা তিথিতে খালি পায়ে অফিস স্কুল কলেজেও যায় । এটাই এদের স্ট্যাটাস সিম্বল । ছেলে মেয়েদেরও জামা কাপড় তেমন জমকালো নয় । অত্যন্ত সাধারন মানের । মহিলারাও কেমন রংচটা শাড়ি পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে । বাসে সবাই মোবাইলে হয় নেট করছে না হয় বই খুলে নিজের পড়া পড়ছে । Simple living and high thinking বোধ হয় একেই বলে । ব্রাহ্মণরা হাল্কা গেরুয়া রঙের ধুতি লুঙ্গির মতো করে পরে । যেমন ফর্সা তেমন ভুরি । সোনায় দানায় বাপ্পি লাহিড়ী ! তবে চলেছেন খালি পায়ে । ধনী ব্যবসায়ীদের পয়সা কেমন তা চেন্নাইয়ের শপিং মল বা শোরুম গুলি দেখে আন্দাজ করাযায় । দামি দামি মার্সেডিস অডি BMW গাড়ী বাড়ির সমনে রাস্তায় পরে আছে ।    


আসলে তামিলনাড়ুতে ঘুরতে ঘুরতে যে জিনিসটি প্রকট ভাবে চোখে বিধল তা হলে গ্রাম ও শহরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈপরীত্য । বিজ্ঞানের কল্যাণে কৃষির অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটলেও শহরকেন্দ্রিক অর্থনীতির কাছে তা নস্যি । শিক্ষিত ছেলে মেয়েরা গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি দিচ্ছে । নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত করছে । গ্রামগুলি তাই আজ ফাকা ! অপর দিকে স্বল্প শিক্ষিত কৃষিজীবি মানুষ হোক বা শহরের বস্তিতে থাকা স্বল্প আয়ের মানুষ তাঁরা কখনই নিজেদের শহরের চিকুরীজিবী, ইন্ডাস্ট্রি বা আইটি সেক্টরের ঝা চকচকে লোকেদের সাথে নিজেকে মেলাতে পারেনা । তাই হাড়ভাঙা খাটুনির পর তাদের থাকতে হয় লুঙ্গিড্যান্স কিংবা অতিমানবীয় চরিত্রের আশ্রয় নিয়ে নতুবা মনের অভিলাসা পূরন করতে হয় সাগর তীরের রঙ্গীন কাটআউটের পাশে দাঁড়িয়ে ফটো তুলে !

হাতে আর বেশি সময় নেই তাই হোটেলে চেক আউট করে সোজা দৌড় । কোলকাতা হয়ে বাড়ি ফিরতে হবেত ! সুতরাং  বিদায় সবুজ নগরী চেন্নাই ।  




কোয়েম্বেডু বাস টারমিনাস বা CMBT চেন্নাই এর সব থেকে বড় বাসস্ট্যান্ড । এখানথেকেই দূরপাল্লার সব বাস ছারে । প্রথম দিন গিয়েছিলাম খোজখবর করতে । কিন্তু সিটিবাস আমাদের নামিয়ে দিল একটি সাধারন বাসস্ট্যান্ডে ! সবই প্রায় লোকাল বাস । ভাবলাম বোধহয় ভুল স্থানে এসেছি । তবে রাস্তার বিপরীতে কত গুলি টুরিস্টবাস সাফাই পরিষ্কার হচ্ছে, যাই সেখানেই জিজ্ঞাসা করি । দেখি একটি ট্র্যাভেল এজেন্সির অফিস, জোরে মাইকে গান হচ্ছে , সামনে বাস দাঁড়ানো, একজন পিঠে ব্যাগ নিয়ে বাসে উঠতে যাচ্ছে আর এক সুন্দরী নেচে নেচে ছেলেটির গাঁয়ে ঢলে পড়ছে ! আরে এতো, লাইট অ্যাকশান ক্যামেরা ! ওহ সিনেমার সুটিং চলছে, তারমানে ওই অফিসও নকল । সুতরাং নকল হিতে সাবধান । শেষে ট্রাফিক পুলিশের কাছ থেকে সঠিক উত্তর পাওয়া গেল । আমরা যে সাদামাটা বাসস্ট্যান্ডে নেমেছিলাম তারই পিছনে আছে দূর পাল্লার বাস টারমিনাস । সুতরাং আবার হাটা । বিশাল বড় এবং সুসজ্জিত বাস টারমিনাস । অনেকটা রিসর্টের মতো । চার দিকে বিভিন্ন খাবারের স্টল, বইয়ের দোকান, তামিলনাড়ু পর্যটন বিভাগের অফিস, ঘরের মাঝে বসার ব্যাবস্থা , উপরের গম্বুজের উচ্চতা প্রায় ১৫০ ফিট্ হবে । এর পেছন দিকটার এক দিকে সরকারি অপর দিকে বেসরকারি বাস সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । এক কথায় অসাধারন । পরদিন বিকেল পাঁচটার সময় কোয়েম্বেডু বাস টারমিনাসে গেলাম । পরের বাস ছারবে আরো এক ঘণ্টা পর । একটু টিফিন করে বাসে উঠে বসলাম । প্রতি জন কন্ডাকটরের গলায় একটি করে সিটি ব্যাঙ্কের যন্ত্র রয়েছে টাকা আপনি ক্যাশ আথবা কার্ডের মাধ্যমে দিতে পারেন । সাথে সাথে প্রিন্টেড টিকিট পেয়ে যাবেন । জিজ্ঞাসা করাতে কন্ডাক্টর বললেন পন্ডি বা পন্ডিচেরী পৌছাতে প্রায় ঘণ্টা চারেক লাগবে । আমরা মনে মনে প্রমাদ গুনলাম ! সেখানে নামতে নামতে ঘড়ির কাটায় বাজবে রাত সারে ১০ টা- ১১ টা ! অর্থাৎ নেমে তারাতাড়ি হোটেলে যেতেনা পারলে সারা রাত খোলা আকাশের নিচেই থাকতে হবে । সুতরাং নতুন করে আবার উৎকণ্ঠা উদ্দীপনা রোমাঞ্চ আরকি চাই ! আমরা চলেছি চেন্নাই হাইওয়ে ধরে । পাশাপাশি তিনটি করে মোট ছয় লেনের রাস্তা । বেশি বলা হবেনা যে এই পথে ভাঙা টেম্পোও নতুন ফেরারির মতো মসৃণ গতিতে ছুটতে পারে । আমরা বসেছি সবার প্রথমে ইঞ্জনের পাশে । অনেকটা NEED FOR SPEED খেলার মতো আমরা ডানে বায়ে বাকিদের টপকে প্রায় রাত ৯ টার নাগাদ একটি বাস স্ট্যান্ডে এসে পৌঁছলাম । কমল গেল সাইডে আর আমি গেলাম দোকানে খাবার কিনতে । এখানেও আলুবন্ডা বাঃ আলুর বড়া, কলা ভুজিয়া ইত্যাদি বিক্রি হচ্ছে । জল বিস্কুট কিচ্ছু খাবার কিনে এসে দেখি সব বাসই দেখতে একই রকম । নাম ঠিকানা সবই তামিলে ! এখন উপায় ? কপাল গুনে বাসের সংখ্যা চার পাচটি তাই উবু-দশ-বিশ করে বাসের ভিতরে গেলাম । তৃতীয় বারে সাফল্য আসলো । দেখি কমল ততক্ষণে জল আর লেমন রাইস কিনে এনেছে । কখন কোথায় পৌঁছাব ঠিক নেই তাই হাতের কাজ এখানেই সারা যাক । খাওয়ার তালে আমিও বাসের নম্বর না দেখার কথা চেপে গেলাম । একোনও বিরিয়ানী বা পোলাও নয়, ফয়েল প্যাকে সাধারন লেবু ভাতবাপরে কি টক্তবে আলুর বড়া দিয়ে খারাপ লাগছেনা । রাত প্রায় ১০টা হাল্কা ঘুম পাচ্ছে হঠাৎ বাসের টারনিং এ ঘুম ভেঙ্গে গেল ! বাস চলেছে অন্ধকার গ্রামের ভাঙা রাস্তা দিয়ে । এটাই কি পন্ডিচেরী ? না বাস আবার উঠল বড় রাস্তায় এবং খানিক পরেই বিশাল তোরণ WEL COME TO PONDICHERRY, না এখনো সব বন্ধ হয়ে যায়নি । আরে এতো একটা শহর । বাস থেকে নেমে অটো নিয়ে গেলাম পার্ক এলাকার একটি হোটেলে নাম ফ্রেঞ্চলজ । 
পন্ডিচেরী ছোট শহর । পায়ে হেটেই সব ঘোরা যায় । একসময় এটি ছিল ফরাসীদের উপনিবেশ । পরদিন সকালে গেলাম গান্ধীবিচে । সামান্য পায়ে হাটা পথ শহরের সব থেকে শান্ত ও সুন্দর জায়গা । চওড়া রাস্তা, তার পাশে সারি সারি ফরাসী আমলের বাড়িঘর আর অপর পাশটি পুরো সমুদ্র । তবে বেলাভূমি বা সৈকত নেই । আছে শরটিকে রক্ষা করার জন্য লক্ষ লক্ষ কালো ব্যসল্ট এর চাই । নিচে নামতে পারেন তবে সাবধানে । এখানেই আছে পুরনো চার্চ, লাইটহাউস, জাহাজ ঘাটা, বি আর আম্বেতকরের স্মিতি
বিজড়িত মিউজিয়াম, এয়ারপোর্ট, ফ্রেঞ্চ অ্যাম্বাসি, ঋষি অরবিন্দের আশ্রম । প্রতিটি রাস্তা সমকোণে অবস্থান করছে তাই পথ হারাবার ভয় নেই । ফরাসী ভাষায় র‍্যু মানে রাস্তা । যেমন মুলা রোজ র‍্যু । এই আশ্রম এলাকায় ভাতের হোটেল নেই বললেই চলে । বাঙালি হোটেলে খাওয়ার থেকে তামিল খাবার খাওয়া অনেক ভালো । এই গরমে তা বেশী উপাদেয় । ফেরার পথে একটি মন্দিরেও গেলাম । সবাই ফুল মালা উপাচার নিয়ে ভিতরে যাচ্ছে । আমরাও গেলাম তবে খালি হাতে । আমাদের লক্ষ্য এখানে নয় ।
দুপুরে স্নানের পর গেলাম ঋষি অরবিন্দের আশ্রমে । প্রায় ছোটখাটো একটা জমিদার বাড়ি । ফরাসী গঠন শৈলীতে তৈরি দুইতলা বাড়ি সামনে ঝুল বারান্দা দিনের তাপমাত্রা প্রায় ৩২ ডিগ্রী তবে সমুদ্র কাছে বলে বাতাস আছে, তাই গাঁয়ে লাগেনা । সাইলেন্স জোন তাই বেশি কথা বলা বারণ । ঢুকতেই একজন কালো চশমা পরা বয়স্ক লোক মুখে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করলেন বেশি নয়, কথা বলা একদমই বারণঢুকে বা দিকে সমাধি স্থল । আবার নতুন ইশারা এল একটু বোস এখানে । চিন জাপান আমেরিকা ইংল্যান্ড ফ্রান্স প্রায় সব দেশের মানুষ জনই বসে আছে এখানে । কিন্তু আমিতো এসেছি এখানে ঘুরতে দেখতে । বলতে লজ্জা নেই প্রায় মিনিট ছয়েকের মধ্যে উঠে পরলাম । মূল বাড়িতে প্রবেশ করলাম । সামনেটা লাইব্রেরী, ভিতরটা বই বিক্রির দোকান আরকি । ভারতের প্রায় সব আঞ্চলিক ভাষাতেই অরবিন্দের লেখা অনুবাদ করা আছে । তাক্ থেকে পছন্দের বই নিয়ে লাইনে দাঁড়ান, ক্যাশে দুইজন মহিলা আছেন । অপর দুইজন বয়স্ক মানুষ তাদের বই প্যাকেট করে সাহায্য করছেন । একজন বয়স্কা মহিলাকে দেখলাম প্রায় হাজার তিনেক টাকার বই কিনতে । হাসি হাসি মুখে ক্যাশ কাউন্টারে তার বই প্যাকেট করা হচ্ছে । সঙ্গে পেলেন অরবিন্দের বাণীর গোটা ছয়েক স্টিকার বিনামূল্যে এছাড়া একটি স্বারক ক্যরিব্যাগপরের জনের বাজেট ২৩০ টাকা ! তিনি পেলেন শুধু কাগজের প্যাকেট । দেখে মনে হল ক্রেতা ও ওই মহিলা দুজনই বাঙালি । সামনের জন আবার শোধালেন দিদি এক-আধটা স্টিকার কি দেওয়া যায়না ? দিদি তখন ইংলিশে ভাইকে হাইকোর্টের নিয়ম বাতলাচ্ছেন । দেখে খারাপ লাগলো ! আসলে ঋষির কি দোষ ? দোষ তাঁদের যারা তাঁকে নিয়ে এভাবে বিপণন করছেন । কমলই আমাদের দুজনের বইয়ের দাম মিটিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এল । আর কিছু দেখার আছে বলে মনে হল না, তাই বাইরে বেরিয়ে এলাম । সামনেই রাস্তার পাশে রয়েছে একটি ফ্রেঞ্চ রেস্টুরেন্ট । একটা লার্জ সাইজের খাটি মোৎজেরেলা চিজে তৈরি পিৎজা ঠাণ্ডা কোকোকোলা দিয়ে খাবার পর আমাদের গরম কমলো ।
 

বিকালে আবার গেলাম সমুদ্রের তীরে । পাঁচটার পর এদিকে গাড়ি চলেনা । সমুদ্রের ধারে মেলা বসেছে, ঠেলা গাড়িতে হরেক খাবারের দোকান । চা কফি ফুচকা চাট্ পাস্তা কি নেই ? তবে দোকানিরা গরীব হওয়ায় ইংরাজী বা হিন্দী কোনটাই ভালো বুঝতে পারেনা । আমি ভারতের প্রায় সবভাষা জানি ! আমার ভাষার দৌড় কত ? কেন, সেই ন্যাশনাল নেটওয়ার্ক বা ডিডি ১ এর মিলে সুর মেরা তুমহারা গানের প্রতিটি লাইনের মতো । মানে ? ওই একই কথা সামান্য কয়েকটি প্রাদেশিক ভাষায় বলা আরকি ! যেমন অ্যাঁয় সুরয় তারো মারো বনেয়া পরঃ সুর নেরিহারোবা তমা মোরো সুরের মিলনে সৃষ্টি হোক চালঃ ঐকতানঃ কিংবা “... গীত অধরঃ মধুর তরানঃ মিলেকদে ইত্যাদি । শুনেই বোঝা যায় কাকের গলায় কোকিলের ডাক এরই উপর ভরসা করে আমরা এসেছি ভারতের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ভারতের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে চাক্ষুস করতে ।


পন্ডিচেরিতে বাইক ভাঁড়া নিয়ে ঘুড়ে বেড়ানো যায় । স্কুটি বাইক মাত্র ৩০০ টাকা সারাদিন, তেল নিজের । আজ আমাদের গন্তব্য অরো বীচ্ ও মাতৃ মন্দির । শহর থেকে মাত্র ১০-১৫ কিমি । বাইক ভাঁড়া নেওয়ার সময়ই তারা একটি ম্যাপ দিয়ে দেবে । চলেছি বাইক নিয়ে হাইওয়ে বরাবর । পিছনে বসে আছে কমল । পথের ধারে সারি সারি হেলানো নারকেল গাছ আর টালির বাকা চারচালা বাড়ি গলি এক কথার অনবদ্য । অরো বীচ্ শহর থেকে দূরে গ্রাম এলাকায় । এতো ফাকা সমুদ্র সৈকত খুবকম দেখা যায় । আশেপাশে দোকান পাট বলতে কিছুই নেই । কিছু মৎস্য জীবিদের নৌকা পড়ে আছে । হয়তো সকালের ধরা মাছ বিক্রি করে তাঁরা বাড়ি ফিরে গেছে । পন্ডিচেরী ও তার আশপাশ অবসর জীবন কাটানোর পক্ষে আদর্শ । কোন কোলাহল চিৎকার কিচ্ছু নেই, শুধু শান্তি আর শান্তি ! একটি নারকেল গাছের ছায়ার বসে পড়ে ফেলা যায় আস্ত একটা উপন্যাস । বসে থাকা যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা । তবে পশিমের জল দেরিতে হলেও পূর্ব উপকুলেও প্রবেশ করেছে । শহর থেকে দূরে এদিকের রিসর্ট গুলির রমরমা অনেকবেশী । 













এবার চলেছি আমাদের পন্ডিচেরী যাত্রার শেষ স্টপেজে । মাতৃ মন্দির । হাইওয়ে ধরে আরো কিছুটা উত্তরে গিয়ে বা দিকে ছোট পাকা রাস্তা । পিচের রাস্তা একে বেকে চলে গেছে, দুই পাশে ম্যানগ্রভ জাতিয় বন । ঠিক একই প্রাকার গাছের জঙ্গল চিল্কাতে যাওয়ার সময়ও চোখে পড়ে, তবে সেগুলি ছিল কাজু বাদামের গাছ, জানিনা এগুলি কি ? অবশেষে পৌঁছালাম । সামনেই পার্কিং এর ব্যাবস্থা । বাইক ছোট গাড়ি বাস সবার আলাদা আলাদা ।  কিছুটা দূর হাটার পথ । মনে হচ্ছে কোন বোটানিক্যাল গার্ডেনের ভিতর দিয়ে হাটছি । এই লাল রুক্ষ মাটিতেও কত সুন্দর লতা গুল্ম বিরুৎ স্বমহিমায় মাথা নেড়ে সকলকে স্বগত জানাচ্ছে । হাতের ডান দিকে একটি সংগ্রহশালা ।
প্রসঙ্গত এটা বলে রাখাই ভালো যে মাতৃ মন্দির বা অরভীল কোন চিরাচরিত ভারতীয় মন্দির নয় । ঋষি অরবিন্দের শিষ্যা Mirra Alfassa (Paris 21.2.1878 - Pondicherry 17.11.73) যাকে আমরা শ্রীমা বলেই বেশি চিনি এটা তারই চিন্তা প্রসূত । ১৯৬৫ সালের জুনের দিকে তিনি এমন এক শহর তৈরির ইচ্ছা প্রকাশ করেন যেখানে, বিশ্ব নাগরিক হিসাবে মানুষ শান্তিতে বাস করবে তাঁর পারস্পরিক সহযোগিতা ও মেল বন্ধনের মাধ্যমে, নিজের সকল প্রকার ধর্মমত, রাজনীতি ও জাতিয়তাবাদের উর্দ্ধে উঠে । মানব জাতির অখন্ডতা অনুভব করানই অরভীলের উদ্দেশ্য ।
       
Universal town where men and women of all countries are able to live in peace and progressive harmony, above all creeds, all politics and all nationalities.  The purpose of Auroville is to realise human unity.

এই শহর তৈরি এখনো সম্পূর্ণ হয়নি । ১৯৭০ সালে ফ্রেঞ্চ স্থাপত্যবীদ Roger Ager মাতৃ মন্দির তৈরির কাজ শুরু করেন । বারোটি বাগান সহ এই বিশ্ব-শহরের মাঝে আছে একটি উপাসনা বা ধ্যান কক্ষ । ১৯৭১ সালে শ্রীমা নতুন একটি নকশা অনুমোদন করেন । এতে শহরের চারধারে উপবৃত্তাকার জলাশয়ের কথা বলা হয় । এই জলাশয় শ্রীমা তাঁর জীবন কালে দেখে যেতে পারেননি । ১৯৬৬ সাল থেকে ভারত সরকার ও বিগত চল্লিশ বছর ধরে  UNESCO নানা ভাবে এই প্রোয়গমূলক শহর টিকে পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে ।  

আরো তথ্য জানতে দেখুনঃ  http://en.wikipedia.org/wiki/Auroville


সংগ্রহশালাটি ভালোই লাগল । বিভিন্ন প্রকার চার্ট মডেল ছবির মাধ্যমে এর ইতিহাসকে সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে । একজন এসে জিজ্ঞাসা করলেন আমরা অরোভীল সম্পর্কিত বায়োস্কোপ দেখতে চাই কিনা ? একটু পরেই শো শুরু হবে । মন সায় দিলেও এই গরমে শরীর সায় দিলনা । বিনীত ভাবে বললাম মাফ করবেন পরে ইউটিউবে দেখে নেব, তিনি হেসে বললেন যান তবে মাতৃ মন্দির দেখে আসুন । মানুষের শাপে বর হয় । আমাদের বেলা হল উলটো ! বিনে পয়সায় এসি থিয়েটারে সিনেমা না দেখে, আমরা চলেছি ৩৭ ডিগ্রি তাপমাত্রার মধ্যে হেটে অরভীল এর কেন্দ্রে পৌছতে । চিনা জাপানি যাকেই পাই এক প্রশ্ন আর কত দূর ? Not too far. 10 minute to walk. কিজানি আজ কিলোমিটার মাইল এরা হরতাল ডেকেছে কিনা ! সবাই দূরত্ব সময়ে মাপছে ? একটু পরে ব্যপারটা পরিষ্কার হল । আসলে মাইলস্টোন দেখে অভ্যাস তো ! অরভীলের পথে পথে রয়েছে টাইমস্টোন । হাটা পথে বিভিন্ন গন্তব্যের সময় তালিকা ! যাইহোক অবশেষে পৌঁছলাম সোনার পাতে মোড়া গোলাকৃতির অডিটোরিয়াম বা মাতৃমন্দিরের সামনে । ভিতরে প্রবেশ নিষেধ । তাই দূর থেকে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটালাম । এখানে একজন সিকুরিটি গার্ড কাম গাইড রয়েছেন । তিনি আঙ্গুল দিয়ে তারা দেখানোর মতো মাতৃমন্দিরের বিভিন্ন অংশের কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করেন । ফেরার সময় আর হাটতে হল না । দর্শনার্থীদের ফেরত নিয়ে যাবার ফ্রি বাস সার্ভিস আছে । বাঁচাগেল নইলে সোনারডিম দেখারপর এতদূর হেটে ফিরলে মনটা সারাদিন খচখচ করত ।







অবশেষে ফেরার পালা । হোটেলে চেক্ আউট করে বেরিয়ে পড়লাম । একটি হোটেলে খাওয়া সেরে উঠলাম বাসে । এসির হাওয়ায় ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে চলেছি উত্তরদিকে করমণ্ডল উপকূল ধরে, গন্তব্য চেন্নাই । 




মূল ভ্রমণ কাহিনী  
বিষদে পড়ার জন্য ক্লিক করুন