2014 এর জানুয়ারী মাস । চেন্নাইতে যখন কয়েকদিন থাকতেই হবে, তখন মনে মনে ঠিক করলাম যে বিষ্ণুক্ষেত্র তিরুপতিতে ভগবান বালাজীর দর্শন করলে কেমন হয় । বন্ধু কমলকে বলা মাত্র সেও রাজী হয়ে গেল । অচেনা জায়গা তায় আবার ভাষাগত সমস্যা তাই আমরা ঠিক করলাম যে ট্র্যাভেল এজেন্সির মাধ্যমে তিরুপতি দর্শনে যাব। যেমন ভাবা তেমনি কাজ, চললাম আমাদের হোটেল রামলক্ষ্মী লজ থেকে পায়েহাটা দূরত্বে চেন্নাই সেন্ট্রাল স্টেশনের বিপরীতে একাধিক ট্র্যাভেল এজেন্সির অফিসে । একটু খুটিয়ে দেখলাম কোনটিতে বেশি ভির, নকল থেকে সাবধান হতে হবেত ! শেষে গিয়ে বললাম : Excuse me we want to go Tirupati…. Is there any bus from here?
আইও রামা তিরুপতি ...... অন্ডা simple 900… AC 1300.
ট্রেনে আসার সময় শুনেছি ... দাদা আলুর বড়া ... আন্না আলু বন্ডা ... কিন্তু, Sorry ‘অন্ডা’ ...?
আইও Each seat on Normal Bus, fare is Rs. 900/- and in AC bus it will be Rs. 1300/- respectively.
যাইহোক আমরা সাধারন বাসের টিকিট কাটলাম। সকাল পাঁচটায় আমাদের হোটেল থেকেই বাস তুলে নিয়ে যাবে । এ কোন বাঙালীর  টাইম নয় পুরো তামিল স্ট্যান্ডার্ড টাইম তাই পাচটা মানে পাঁচটা । সকালে উঠতে হবে বলে তারাতারি ঘুমিয়ে পড়লাম। আনন্দ উৎকণ্ঠাতে রাত কাটল । সকাল চারটার মধ্যে উঠে স্নানে গেলাম । কমল এখনো শুয়ে , আরে ভাই পাঁচটা মানে কি ডট পাঁচটা ? আমি কোন উত্তর করলাম না । যা হওয়ার তাই হল , যথা সময়ে বাস আসায় আমাদের, ঘারে জামা, হাতে বেল্ট এইভাবেই বাসে উঠতে হোল । ভাগ্যিস পিঠ ব্যাগটা আগের দিন গুছিয়ে রাখা ছিল তাই অপ্রস্তুত হলেও বেগপেতে হয়নি। চেন্নাইতে ট্রাফিক খুব কড়াকড়ি তাই এতো সকালেও আমাদের বাসটা ঘড়ির কাটার মতো পাক খেতে খেতে প্রতিটি হোটেল থেকে যাত্রী তুলতে লাগলো এবং আরো বার দুয়েক আমাদের হোটেলের সামনা দিয়ে চক্কর কেটে শেষে ট্র্যাভেল এজেন্সির সামনে দাড়ালো। শুনলাম এই বাস নাকি যাবেনা ...একজন আধিকারিক জানালেন যাত্রী কম থাকার জন্য যারা সাধারন বাসের টিকিট কেটেছে তাঁরা শীততাপ নিয়ন্ত্রিত বাসেই যেতে পারবে, তবে আরো একশো টাকা করে পারানি (Fare) লাগবে। কমল মিটিমিটি হেসে বলল সকাল সকাল ভাই লাভের মুখ দেখছি মনে হচ্ছে । এ কদিন চেন্নাইতে আধা হিন্দী আধা তামিল ভাঙ্গা ইংরাজী বলতে বলতে মুখের পাটি প্রায় বেকে গিয়েছিল ... এখনও দুজনে মুখখানা বাংলার পাঁচ করেই বসেছিলাম কিন্তু একি ? ত্রিশ জন যাত্রীর মধ্যে প্রায় পচিশ জনেই বাঙালি ! সবাই এসেছে চিকিৎসার কাজে, কেউ আসাম, কেউ আগরতলা, কেউবা কোলকাতা এমনকি বাংলাদেশ থেকেও । জানিনা বাঙালি মানেই রোগের আরতদার কিনা তবে এটুকু বুঝলাম যে নিজের জায়গায় আমরা যতই ঘটি-বাটি, উত্তর- দক্ষিণ করিনা কেন দেশান্তরে আমরা এক । বাঙালি পাগলও বটে ! ভ্রমণ পাগল ! না হলে আমরা দুজন গরমের ছুটিতে গরম উপভোগ করতে গরমের স্থানে আসি । বাকিরা এসেছে রথও দেখতে ... চিকিৎসার বিভিন্ন টেস্ট এর রেজাল্ট দু-তিন দিন পড়ে হয় তাই বসে না থেকে চলো ঘুরে আসি , সেক্ষেত্রে তীর্থ করা মন্দ কি ?
চেন্নাই শহর থেকে উত্তর পূর্বে প্রায় একশ কিমি দূরে তামিলনাড়ু ও অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের সীমানায় তিরুমালা পর্বতের ঢালে লর্ড ভেঙ্কটেশ বা তিরুপতি বা বালাজী মন্দির । পর্বতের পাদদেশে গড়ে উঠেছে তিরুপতি শহর এখান থেকে পর্বতের উপরে উঠতে হবে । পর্বতের ঢালে গড়ে উঠা জনপদের নাম তিরুমালা । চেন্নাই শহর থেকে বেড়িয়ে বাস চলতে শুরু করেছে উষর রুক্ষ লাল মাটির পথ বেয়ে । কালো কাঁচের মধ্য দিয়েও বাইরের প্রখরতা অনুমান করা যায় । ভেতরের নিয়ন্ত্রিত তাপ মাত্র বারো ডিগ্রী । হায়রে ! এখানেও কি নিজেদের অস্তিত্ব প্রমান করতে হবে আমাদের ? একে একে চাঁদর, সোয়টার, মাফলার বেরহতে লাগলো নিজ নিজ ঝোলা থেকে ! পরিশেষে একটাই দাবি ...দাদা এসি টা বন্ধ করা যায়না ? ভগবান সহায় ... আমাদের গাইড ভাঙা হিন্দী বলতে ও বুঝতে পারে তাই বেগ পেতে হল না ।  তবে অবস্থাটা বোধ হয় আমাদের সহায় ছিলনা ... বন্ধ জালানার ক্যাপসুল চেম্বার, ক্রমশ হিটলারের গ্যাস চেম্বারে পরিণত হল । অগত্যা আবার দাবি ... এসি চালাও... বাস থামাও ... বমি করব ! একবার দুইবার তিনবার ... উফ্ বারবার ! মোটামুটি এই দল নিয়ে এয়ার ট্র্যাভেল করলে আট দশটা শহর এমনি দেখা হয়ে যাবে ! যাইহোক মাঝে একটি ধাবাতে ইডলি পোঙ্গাল কফি প্রভিতি জলযোগ করে বেলা এগারোটা নাগাদ তিরুপতি শহরে পৌঁছলাম । এখান থেকে অন্ধ্রপ্রদেশের সরকারী বাসে করে তিরুমালা পর্বতে উঠতে হবে । যেহেতু প্যাকেজে খওয়া দাওয়া গাড়ি ভাঁড়া সবই ধরা আছে তাই গাইডের পাশাপাশি থাকাটাই শ্রেয় । দলছুট হলে দর্শন তো দূরে থাক চেন্নাই ফেরাও চাপ হয়ে যাবে । সুতরাং পাগলা চুলকে লাভ নেই । গাইড আমাদের সকলের টিকিট করে একটি আলাদা বাসের ব্যবস্থা করলেন । পেট ভরাই ছিল তাই জয় গোবিন্দা নাম নিয়ে বাসে উঠে বসলাম । এতক্ষনের যাত্রাপথে দুধারে ছিল অনুচ্চ টিলা ঢিপি অনেকটা শোলে সিনেমার ক্যনভাসের মতো ... টিলা আবার পর্বত নাকি ? কিন্তু এখন সামনের বাঁক ঘুরতেই টের পেলাম কেনো এটি তিরুমালা পর্বত ! 
প্রথমেই চেকপোস্ট , এতদিন এয়ারপোর্টে দেখছি মানুষের ব্যাগ স্ক্যান করা হয়, এখানে দেখলাম মানুষ সহ গোটা বাসকেই স্ক্যান করা হয় । মানে ছোটখাটো একটা এক্সরে- বাসস্ট্যান্ড । 
বন্ধু কমল
প্রথমে চার লেনের রাস্তা, পরে দুই লেনের এবং শেষে ওয়ান ওয়ে । এতো পরিষ্কার রাস্তা আমি ভারতের যত শৈলশহরে গেছি কোথাও দেখিনি । কালো পিচের রাস্তা, পাশে সাদা টাইলস্ বিছানো ফুটপাথ, লাল-সাদা গতিবেগ ও পথ নির্দেশক সূচক , সবুজ রঙের বন্যপাণ সম্পর্কিত সাইনবোর্ড , উপরি পাওনা হিসাবে নানা রংবেরঙের ফুল লতা গুল্ম এক কথায় অসাধারন । ভেবেছিলাম কত আর উচু হবে ? কিন্তু একে একে যখন ঝর্না, মেঘের আনাগোনা শুরু হল তখন এতক্ষনের ক্লান্তি ভুলেগেলাম । আমাদের পথ চলেছে ভারতের একটি সমৃদ্ধ বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে যার নাম তিরুমালা জাতীয় অভয় অরণ্য । একে একে সাইনবোর্ডে দেখতে পেলাম হাতি চিতা হরিণ ভাল্লুক সম্বর প্রভৃতিদের আনাগোনার পথ বা করিডোর । তিরুপতি থেকে তিরুমালা আসার জন্য বাইক ভাঁড়া পাওয়া যায় । 












শুধু এই পথে বাইক চালানোর জন্যও বার বার আসা যায় । তবে তিরুপতি থেকে তিরুমালা আসার পায়েহাটা পথও আছে । এই হাঁটাপথ কখনো বাস রাস্তার নিচদিয়ে কখনো উপর দিয়ে চলে গেছে । প্রায় হাজার পাঁচেক সিড়ি হবে ! এপথে অনেকে চলেছেন দণ্ডী কাটতে কাটতে নিজেদের অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্যে । অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে তিরুপতি থেকে তিরুমালার মাত্র পচিশ কিমি পথে আমরা বাস্তবের রুক্ষ মাটি থেকে স্বর্গের মনোরম পরিবেশে পৌঁছেগেলেম । ঘড়ির কাঁটায় দুপুর সারে বারোটা । 
সামনের সুপার মার্কেটের গাইড নির্দিষ্ট স্টলে নিজেদের মোবাইল , ক্যামেরা, জুতা, চামড়ার বেল্ট, ব্যাগ প্রভৃতি রেখে নিজেদের টোকেন নিয়ে মন্দিরের উদ্দেশ্যে হাটা লাগালাম । পাহাড় কেটে এখানেও একটি ছোট শহর তৈরি করা হয়েছে নাম তিরুমালা । দুই লেনের রাস্তা পেড়িয়ে একটি বিশাল বড় চাতাল এরপর লোহার গেট। গেটের ভিতর থেকেই শুরু হল লোহার খাঁচার অলিগলি । প্রায় আড়াই থেকে তিন ফুট চওড়া ছয় থেকে সাত ফুট উচু লোহার ফেসিন্স, মাথার উপর টিনের চাল, তাতে লাইট ফ্যান মাইক সবই আছে ।  পাশাপাশি দুটি তিনটে কখনো চারটি পথ প্রায় সমান্তরাল ভাবে এগিয়ে চলেছে । ছোটবেলায় খেলা লুডুর সেই সাপ-মই খেলার মতো প্রতিটি পথ কখনো কোন বড় রাস্তার উপর দিয়ে কখনোবা নিচ দিয়ে একেবেকে চলছে । প্রতিটি পথের প্রায় দুশো মিটার পরপর পুরুষ ও মহিলাদের টয়লেট, প্রায় পঞ্চাশ মিটার পরপর পানীয় জলের কল বেসিন সবই আছে ... কিন্তু কথা একটাই ... মাঝপথে ক্ষান্ত দেওয়া বা পিছন ফেরা অসম্ভব । 
প্রথম দিকটায় প্রায় ফাকাছিল তাই জোরে হাটা লাগালাম সবাই, কিন্তু একি আর কত দূর ? প্রায় এক কিমি হাটার পর আবার একটি ফাটকের সামনে দাড়ালাম । আবার স্ক্যান, তল্লাসির পর টিকিট কাটা । দর্শন দক্ষিণা ৩০০ টাকা প্রতিজন সাথে ২ টি করে লাড্ডু প্রসাদ বিনামূল্যে । লোহার খাঁচা পথ ছেড়ে আমরা এখন একটি বিল্ডিং এর ভেতরে গেলাম । ভিতরে প্রচণ্ড ভির অতএব দুনিয়ার বাঙালি এক হও ! অর্ধচন্দ্রাকৃতির তিনতলা বাড়িটা দেখতে অনেকটা লর্ডসের স্টেডিয়ামের মতো । ভেতরে ছোট ছোট ব্লক বা ঘর । প্রতিতি ঘরে স্টেডিয়ামের মতো ঢাপে ঢাপে বসার চেয়ার, টিভি, ফ্যান , টয়লেট বাথরুম কি নেই ? চেয়ারে বসে সামনে তাকালে তিরুপতি মন্দিরের সোনার চূড়াটি দেখা যায় । আমাদের ব্লকের নম্বর ২১ । আগের ব্লকটি ফাকা হলে আমরা তাতে প্রবেশ করবো ! শুরু হল আবার অপেক্ষা ! স্বস্তি একটাই এখানে বসার জায়গা আছে, কিছু ফেরিওয়ালা জলের বোতল, ফ্রুটি, মাজা, খিচুরি বিক্রি করছে, তবে গারদ বলে কথা ! পালাবার পথ নেই । প্রায় চল্লিশ মিনিট পর পাশের লোহার গেট খুলল । এখন তাপমাত্রা প্রায় ৩৭ ডিগ্রীর কাছাকাছি । ঘামে জবজবে জামাকাপড়, পেটে ক্ষিদা, অসহ্য গরম, তাতে শুরু হল আবার অস্তিত্বের সংগ্রাম ... সুতরাং দৌড় দৌড় দৌড় ... । ২১ নম্বর ব্লক থেকে ১১ নম্বর ব্লকে আসতে প্রায় বিকাল হয়ে গেল । পেটে আছে বলতে ওই ২০ টাকার ফ্রুটির সানান্য স্মৃতি । শিশুর কান্না, বৃদ্ধ বৃদ্ধার আকুতি, ছেলেদের চিৎকার, মেয়েদের আর্তনাদ কিছুই আর কানে ঢুকছেনা ! চুড়ান্ত মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে একে একে পরের ব্লক গুলিতে এগতে লাগলাম । ঠেলাঠেলি গুতোগুতির স্রোতে গা ভাসানো ছাড়া উপার নেই । চিৎকার চেঁচামেচি ধাক্কাধাক্কির মধ্যে ধীরে ধীরে তামিল তেলেগু মালায়লম্ হিন্দী সবাই নিজেদের দাঁত নখ্ গুলিকে বার করতে শুরু করেছে । আমরাও পিছিয়ে নেই ! শুরু হল তর্ক বিতর্ক ঝগড়া গালাগালি, কে কাকে ধাক্কা দিয়েছে তা নিয়ে ! এই ভাবেই কখন যেন ১ নম্বর ব্লকে চলে এসেছি, এসির বাতাসে প্রান জুরিয়ে গেল । ভগবান কি জানেন ভক্তকে শান্ত করতে কখন কোন টোটকার প্রয়োজন ? আবার সিড়ি ! ও হ্যাঁ আমাদের মাথার উপরেওত দুটি তলা আছে, তবে কি সেখানকার মানুষও আমাদের সাথে মিলিত হবে ? চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে আবার নিজেকে প্রস্তুত করলাম ।   দুই তলায় তিন ও এক তলার মানুষ একত্রিত হয়ে সেখান থেকে জাহাজে উঠার জেটির মতো ব্রিজে করে মূল মন্দিরের চাতালে প্রাবেশ করছে । আবার দেহে প্রান ফিরে পেলাম । যতই সামনের দিকে এগোচ্ছি দেহের সকল ক্লান্তি ধীরে ধীরে দূর হতে লাগল ... মনে হচ্ছে আরো সজীব হয়ে উঠছি । প্রাচীন পাঁথরের মন্দির, তারই দেওয়াল ঘেঁসে এগিয়ে চলেছি । এখন লোহার বদলে পেতলের খাঁচা এই আরকি ! আবার একপ্রস্থ তল্লাসি ও স্ক্যান হল । এবার একটি পাঁথরের বড় ফাটক পেরিয়ে মূল চাতালে প্রবেশ করলাম । কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরে দেখেছি সোনার গম্বুজ-রূপোর ছাদ, অমৃতসরের স্বর্ণ মন্দিরে দেখেছি সোনার গম্বুজ ও দেওয়াল তবে হাতের নাগালের বাইরে । কাঞ্চীপূরম মন্দিরে দখলাম পুরো সোনার সিড়ি, আর এখানে আস্ত সোনার মন্দির ! এইবার শুরু হল চরম বিশৃঙ্খলা আর ধাক্কাধাক্কি, কোথার বন্ধু কোথায় সহযাত্রী ধুলায় অন্ধকার ! প্রান বাঁচাতে শুরু হল জীবনের শেষ সংগ্রাম... কোনক্রমে মূলগৃহে ঢুকে বাদিকে ফেরামাত্র সামনের গর্ভগৃহে দাঁড়িয়ে আছেন প্রভূ লর্ড ভেঙ্কটেশ । কালো কষ্টি পাঁথরের মূর্তি । কপালে সোনার প্লেট যা চোখ দুটিকে আড়াল করে রেখেছে । হয়তো পাপীতাপী মানুষের সেই স্পর্ধা নেই চোখে চোখ মেলানোর, তাই এই প্রয়াস । এখন কোন চিৎকার, কোন ধাক্কাধাক্কি আর গাঁয়ে লাগছেনা, আরো ভালোভাবে, আরো কাছথেকে দেখার জন্য জীবনের শেষ শক্তি নিঙরেদিচ্ছি । অতঃপর দর্শন প্রনাম প্রনামী ও বিদার । সারিবদ্ধ ভাবে এগিয়ে চলেছি । একাধিক টিপকল দিয়ে দেবজল পড়ছে ! পুরোহিতরা ভক্তের মাথার রূপোর মুকুট ঠেকিয়ে মঙ্গল কাম্না করছেন ভালো প্রনামীর বিনিময়ে । একটু এগতেই হাতে পড়ল প্রসাদ হিসাবে এক বাটি দইভাত ।  পাঁথরের ফাটকটি পেরিয়ে কিছক্ষন ঘোরাঘুরির পর একে একে দেখাহল বন্ধু কমল ও বাকি সহযাত্রীদের সাথে । 
এবার কুপন দেখিয়ে লাড্ডু প্রসাদ নেওয়ার পালা । প্রসাদঘর একটু দূরে । আবার লাইন । কমল দাঁড়াল প্রসাদের লাইনে । আমি দাঁড়ালাম ঠোঙা বা ক্যারিব্যাগ কেনার লাইনে । একটি ব্যাগ ৫ টাকা । এবার গাইডের উদ্দেশ্যে সেই সুপার মার্কেটের দিকে হাটা । গাইড আমাদের জন্য অতিরিক্ত লাড্ডু কিনে রেখেছে । পাশেই একাধিক দোকান, খাবার দোকান, পান বিড়ি নাপিত, ইত্যাদি সবই আছে । যেহেতু সবাই এখনো আসেনি তাই কমল গেল দাঁড়ি কাটতে, আমি গেলাম বাড়ির সবার জন্য কিছু কেনাকাটি করতে । গরম গরম লচ্ছা পরোটা আর জিলিপি দুজনের খারাপ লাগছেনা । গাড়িতে উঠার পালা। ধুর কোথায় কি এখনো তিন চার জন আসেনি । আমি বাসের সামনে পায়চারি করতে লাগলাম । কমল গেল কোলকাতার বৌদিকে নিয়ে দাদাকে খুজতে । দাদা আবার কেনাকাটি করে এসে আবার গেলেন বৌদিকে খুজতে । হাল্কা বৃষ্টি পড়ছে শীতও করছে, উপায় নেই আমাদের পিঠব্যাগ আছে ২৫ কিমি দূরে তিরুপতির বাসস্ট্যান্ডে রাখা এসি বাসে । এখনো একের পর এক বাস তীর্থ যাত্রীদের নিয়ে আসছে । এঁরা এখন লাইন দিয়ে ভোর রাতে বিগ্রহ দর্শন করে কাল দুপুরে চেন্নাই পৌঁছাবে । সত্যি ! তিরুমালা ও তিরুপতির বাস পরিসেবা সারা দিন সারা রাত চলে । শহরও ঘুময় না । প্রায় রাত আটটার দিকে আমাদের বাস ছাড়ল । ফেরার পথ আলাদা । কিন্তু একি ! এতো কোলকাতার নিক্কো পার্কের রোলার কোস্টারকেও হার মানায় । প্রায় খান দশেক ইউটার্ন সাত-আটেক হেয়ারপিন্ টার্ন নিয়ে মাত্র আধঘণ্টার মধ্যে তিরুপতি শহরে পৌঁছে গেলাম । ভালো করে নিজেদের জিনিস দেখে নিয়ে বাস ছেড়েদিয়ে বড় রাস্তা পেরিয়ে আমরা গেলাম এখানকার একটি ভালো হোটেলে । হাতমুখ ধুয়ে বসে পরলাম খেতে । সাউথ ইন্ডিয়ান থালি । প্রথমে রুটি পড়ে ভাত, সাথে দশ রকমের সব্জি ডাল পাঁপড় ... দই মিষ্টি এক কথায় অমৃত ।  এখন রাত নটা, পরে কি কপালে জুটবে তাই ভালো করেই কব্জি ডোবালাম । একটু হাঁটাহাঁটির পর সবাই উঠলাম বাসে । যারযার সিটে নিজেদের ব্যাগপত্র একই ভাবে পড়ে আছে । এটি দক্ষিন ভারত কিছু হারাবার ভয় নেই তবে নিজেই যদি কিছু হারিয়ে ফেলেন তবে ফেরত পেতে সুকতলা ক্ষয়ে যাবে । ফেরার পথে আরো কিছু মন্দির দেখার কথা ছিল কিন্তু পরিশ্রান্ত বলে কেউই তেমন নামল না । পরিশ্রান্ত দেহে খাওয়া দাওয়ার পর এসিতে ঘুমতে ঘুমতে আসা এক কথায় অনবদ্য । রাত সারে এগারটার নাগাদ সকালের সেই ধাবার সামনে বাস থামল । একটু চা কফি আরকি ! গাইড বলল চেন্নাই ফিরতে ফিরতে রাত এক দুটো বাজবে । আমদের হোটেল স্টেশনের কাছেই তাই দুজনে প্ল্যান করলাম যদি হোটেলের দরজা না খোলে তবে স্টেশনে গিয়ে ওয়েটিং রুমে রাত কাটাব । রাত একটার দিকে চেন্নাই আসলাম। হোটেলের সামনে বাস আসলো রাত দেরটার দিকে । অল্প ডাকাডাকি করতে দেখি গার্ড দরজা খুলেদিল । জয় গোবিন্দা ... জয় বালাজী ...!!

Note:
 সাধারণত একা একা না গিয়ে গাইডের সাথে বা কন্ডাকটেড টুরে যাওয়া ভালো। 
গাইডের ফোননম্বর ও বাসের নম্বর নোট করে রাখুন ।
গাইডের সাথে সাথে থাকুন বর্তমানে তিনিই আপনার অবিভাবক ।
জল বিস্কুট ও অয়ারেসের প্যাকেট সাথে রাখুন । বাইরের জল খাবেন না ।
সাথে ছোটো বাচ্চা থাকলে না যাওয়াই শ্রেয় । বয়স্কদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযজ্য ।
আপনার সংস্কৃতি এদের সাথে নাও মিলতে পারে, এমন কিছু করবেন না যাতে আপনি সমস্যায় পড়েন ।
যাওয়ার সময় হোটেলে বলে যান, তারাও আপনার ফেরার সময় সজাগ থাকবে ।  





মূল ভ্রমণ কাহিনী  
বিষদে পড়ার জন্য ক্লিক করুন

1 comment :

  1. No pain No gain........Jai Gobinda ........Jai Balaji.........

    ReplyDelete